দেশের মানুষ সংকটে থাকায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে বিরোধিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
বুধবার রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াত বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘গোটা সমাজ একটা সংকটের মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। আমরা সংসদ সদস্যরা আমাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াবো, প্রশ্নই ওঠে না। সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরা সুস্পষ্টভাবে বিরোধিতা করব। নতুন পে স্কেল ঘোষণার পর একটি পক্ষ এ বিষয়ে চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সংসদ সদস্য হতে গিয়েছি জনগণের প্রয়োজনে। বেতনের বিনিময়ে সংসদ সদস্যগিরি করতে যাইনি। ১৮ কোটি মানুষের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হলে তখন সবার সঙ্গে অংশীদার হতে আমাদের আপত্তি থাকবে না।’
দেশের শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের সংকট নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘উৎপাদন কমে গেলে শিল্পমালিকেরা সংকটে পড়বেন, শ্রমিক ছাঁটাই হতে পারে। এতে তাদের পরিবারও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়বে। একজন লোক বিপদে পড়ার মানে একটা পরিবার বিপদে পড়া। এসব বিষয় সত্য হিসেবে তুলে না ধরলে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এক লিটার জ্বালানির দাম ২০ টাকা বাড়লে এর প্রভাব পরিবহন ব্যয়, পণ্য পরিবহন ও বাজারদরে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ চাকরি করেন, কিন্তু তার চাকরির টাকায় সংসার চলে না। সন্ধ্যায় বা চাকরি শেষে তিনি বাইকে রাইড শেয়ার করেন। সেই ভাই বোঝেন ২০ টাকা বাড়লে তার কী হয়েছে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সরাসরি প্রভাব পড়ে। বাজারে সবকিছুর দাম বেড়ে যায়।’
আশপাশের দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতির তুলনা প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তাদের অর্থনীতি আর আমাদের অর্থনীতি এক জায়গায় আছে কিনা?’
জামায়াতে ইসলামী সরকারি প্লট ও সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা নেবে না বলে আগের সিদ্ধান্তের কথা জানান শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অটুট রয়েছি। সরকারি প্লট নেবো না। সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি কেনার সুযোগ আছে, সেটাও নেবো না। আমরা পেরেছি।’
সরকারি দলও একই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাদের অভিনন্দন জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কপাল-কিসমত গড়ার জন্য সংসদে যাইনি। সবাই বলেছেন, আমি শাসক নই, সেবক হতে চাই। তাহলে শাসকের মানসিকতা থাকবে কেন? সেবকের মানসিকতা থাকা উচিত।’
বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের দেওয়া নোটিশ সংসদে আলোচনায় না আসার অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি, সার, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু সব নোটিশ আলোচনায় আনা হচ্ছে না।’
তেলের সংকট নিয়ে একটি নোটিশের পর সরকারি ও বিরোধী দলের পাঁচজন করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি। তার দাবি, কমিটি গঠনের পর মানুষের আতঙ্ক কমে যায়।
জামায়াতের সাম্প্রতিক লংমার্চ নিয়ে সমালোচনার জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘কর্মসূচিগুলো শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খলভাবে পালন করা হয়েছে। কর্মসূচি বানচাল করতে কেউ আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে থাকলে তার দায় তাদের।’
গণমাধ্যমকে সত্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বক্তব্যের অংশবিশেষ নিয়ে ‘ফটোকার্ড’ তৈরি করায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি ইন্টারভিউতে যা বলি, ফটোকার্ডে তা আসে না। মিসলিড করা হয়। কাটপিস, লেজ নাই, মাথা নাই, মাঝখান থেকে শুধু পেট উঠিয়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মানুষ কনফিউজড হয়।’
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণমাধ্যম ঠিক থাকলে রাষ্ট্রের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি শক্তিশালী থাকে।
সাংবাদিকদের বেতন-বোনাস ও অন্যান্য অধিকার নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে কথা বলার আশ্বাসও দেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা জানান, বিভিন্ন দেশে সফর করলেও তিনি সরকারি খরচে যাননি। রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চান না বলেও জানান তিনি।
নিজের জন্য বরাদ্দ সরকারি বাসাটি স্থায়ীভাবে দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালনে সেটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, সংগঠন ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপিসহ দলটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


