প্রায় ৩ দশক পর পশ্চিম ইউরোপের আকাশে দেখা গেল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। বুধবার সন্ধ্যায় চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতেই উত্তর স্পেনের বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তের জন্য ডুবে যায় অন্ধকারে। বিরল এই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখতে দেশটির গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলোতে জড়ো হন লাখো মানুষ।

মাদ্রিদের উত্তরে বুইত্রাগো দে লোসোয়া এলাকায় গ্রহণ দেখার জন্য তৈরি করা বিশেষ পর্যবেক্ষণস্থলে দর্শকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার কিছু পর পূর্ণগ্রাস শুরু হলে অনেকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়েন, খুলে ফেলেন বিশেষ সুরক্ষা চশমা। সূর্যের আলো চাঁদের কিনারা ঘেঁষে ছোট ছোট উজ্জ্বল বিন্দু হিসেবে ঝলসে ওঠে, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ‘বেইলি’স বিডস’ বলা হয়। স্থায়ী হয়েছিল মাত্র এক মিনিটের মতো।

মাদ্রিদের অর্থনীতিবিদ ৩২ বছর বয়সী দিয়েগো ফার্নান্দেজ বলেন, পূর্ণগ্রাস শেষ হওয়ার পর আলো ফিরে আসার দৃশ্যটি ছিল অবিশ্বাস্য। প্রথমে লালচে আভা, তারপর ধীরে ধীরে নীল—মনে হচ্ছিল যেন সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের দৃশ্য। মাদ্রিদের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী রাফায়েল হিমেনেজের কাছে পুরো ঘটনাটি মনে হয়েছে কল্পবিজ্ঞানের কোনো দৃশ্যের মতো।
স্পেনের আগে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ছায়া পড়ে আইসল্যান্ডে। তবে দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় মেঘের আড়ালে ঢাকা ছিল সূর্য। পশ্চিম প্রান্তে মেঘের ফাঁক দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা মহাজাগতিক দৃশ্যের আভাস পান। রাজধানী রেইকিয়াভিকে পূর্ণগ্রাস সরাসরি দেখা না গেলেও দিনের আলো হঠাৎ নিভে যাওয়ার অনুভূতি স্পষ্ট ছিল।
পশ্চিম ইউরোপে ২৭ বছর পর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে স্পেন ও আইসল্যান্ডে জড়ো হন লাখো মানুষ। বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘এক্লিপস চেজার’দের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকরাও ছুটে যান গ্রহণের পূর্ণগ্রাস পথের দিকে। পূর্ণগ্রাস শুরু হওয়ার কাউন্টডাউন শেষে দর্শকদের উল্লাস ও করতালিতে চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে।

স্পেন সরকার আগেই ধারণা করেছিল, গ্রহণের পথজুড়ে উত্তরাঞ্চল ও বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৬০ লাখ দর্শনার্থী আসতে পারেন। বিপুল জনসমাগম সামলাতে দেশজুড়ে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয় এবং আকাশপথে নজরদারি ও জরুরি ব্যবস্থাপনায় প্রায় ১০০টি বিমান ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়।
আইসল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৪ মিনিটের দিকে পূর্ণগ্রাস শুরু হয়। সেখানে সর্বোচ্চ ২ মিনিট ১৩ সেকেন্ড পর্যন্ত পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসে।

সূর্যগ্রহণের বিরলতা এই উন্মাদনার অন্যতম কারণ। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতি ১৮ মাসে একটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটলেও নির্দিষ্ট কোনো স্থান থেকে এমন দৃশ্য দেখা অত্যন্ত বিরল। একই জায়গায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ফিরে আসতে গড়ে প্রায় ৪০০ বছর লেগে যেতে পারে।
স্পেনের জন্য অবশ্য অপেক্ষার সময় তুলনামূলক কম। ২০২৭ সালের ২ আগস্ট আবারও দেশটিতে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এরপর ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে দেখা যাবে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। পরপর তিনটি গ্রহণের এই ধারাকে বলা হচ্ছে ‘আইবেরিয়ান এক্লিপস ট্রায়ো’। এর আগে আইবেরীয় উপদ্বীপে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল ১৯১২ সালে।

এদিকে যুক্তরাজ্যে এই গ্রহণ ছিল আংশিক। দেশটির অধিকাংশ এলাকায় চাঁদ সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢেকে দেয়। ১৯৯৯ সালের পর এটিই যুক্তরাজ্যে দেখা সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ। মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে পরিষ্কার আকাশে দৃশ্যটি ভালোভাবে দেখা গেলেও উত্তরাঞ্চল, স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে মেঘ ছিল বেশি।
আগামী কয়েক বছরকে বিশ্বজুড়ে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হচ্ছে। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তিনটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। তবে যুক্তরাজ্য থেকে সেগুলোর কোনোটিই পূর্ণগ্রাস হিসেবে দেখা যাবে না।
ইউরোপে পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সম্ভাব্য সময় ২০৯০ সাল।


