নিষিদ্ধ বিপদজনক মাদকদ্রব্যকে আলাদা করে অধ্যাদেশ জারি করতে সরকারের কাছে আবেদন করেছে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
একই সঙ্গে আমদানিযোগ্য নিয়ন্ত্রিত অ্যালকোহল ও অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়ের জন্যও আলাদা অধ্যাদেশ জারি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ কে বিভক্ত বা সংস্কারের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
গত ২১ অক্টোবর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কাছে লেখা এক চিঠিতে এসব আবেদন করেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর এম জাহাঙ্গীর হোসেইন ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহিদ আজম। আবেদনের অনুলিপি তারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককেও দিয়েছেন।
আবেদনে বলা হয়, বর্তমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিষিদ্ধ বিপজ্জনক মাদকদ্রব্য এবং মানবভোজ্য বৈধ অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পানীয়কে একই আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের জন্য বৈষম্যমূলক এবং অনৈতিক।
তারা উল্লেখ করেছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস শুরু হয় ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ ভারতের ‘দ্য ওপিয়াম অ্যাক্ট–১৮৭৮’জারির মাধ্যমে। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালে ‘দ্য ডেঞ্জারাস ড্রাগস অ্যাক্ট’ প্রবর্তিত হয়, যা সমাজ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রথম আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।
পরবর্তীতে জাতিসংঘ পর্যায়ক্রমে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন গ্রহণ করে। এগুলো হলো—১৯৬১ সালের ‘সিঙ্গেল কনভেনশন অন নারকোটিকস ড্রাগস’, ১৯৭১ সালে ‘কনভেনশন অন সাইকোট্রোফিক সাবস্ট্যান্স’, ১৯৮৮ সালে ‘ইউএন কনভেনশন এগেইনস্ট ইল্লিসিট ট্রাফিক ইন নারকোটিকস ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রোফিক সাবস্ট্যান্স।
এসব কনভেনশনে মানবভোজ্য অ্যালকোহলকে বিপজ্জনক মাদকদ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত না করে আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, বাংলাদেশও এসব কনভেনশনের সদস্য রাষ্ট্র হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই পৃথকীকরণ নীতিকে দেশের আইনে প্রতিফলিত করা প্রয়োজন।
অ্যাসোসিয়েশন বলছে, হুইস্কি, ভদকা, রাম, জিন, টেকিলা, বিয়ার ও ওয়াইনসহ মানবভোজ্য অ্যালকোহলজাত পানীয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত কোডের অধীনে বৈধভাবে আমদানি ও বিক্রি হয়।
তারা সরকার অনুমোদিত লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী হওয়ার পরেও, পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৬৫০ শতাংশ পর্যন্ত কর ও শুল্ক দেওয়ার পরেও নিষিদ্ধ মাদকের সঙ্গে তাদের ব্যবসাকে এক কাতারে ফেলে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এটি সামাজিকভাবে অপমানজনক এবং ব্যবসাবান্ধব নয়।
আবেদনে বলা হয়েছে, একই আইনে বিপজ্জনক নিষিদ্ধ মাদক ও বৈধ অ্যালকোহল একসঙ্গে থাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু অসাধু কর্মকর্তারা হয়রানির সুযোগ পাচ্ছেন।
আইনের জটিলতা ও অপব্যবহারের কারণে বৈধ লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রেপ্তার হচ্ছেন, যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তাদের জীবন ধ্বংস করছে।
পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং আইনগত বিভ্রান্তি দূর করতে সংগঠনটির নেতারা সরকারকে দুটি আলাদা আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। এগুলো হতে পারে বিপজ্জনক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫, অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পানীয় নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫।
তারা বলছেন, এই দুটি অধ্যাদেশ জারি হলে বৈধ ব্যবসা ও নিষিদ্ধ মাদক কারবারের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন তৈরি হবে। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে পর্যটন শিল্প হবে আধুনিক, স্বচ্ছ ও টেকসই।
অ্যালকোহল ও পর্যটন শিল্প একে অন্যের পরিপূরক উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হলে বৈধ অ্যালকোহল ব্যবসায় সুসংগঠিত নীতি দরকার।’
এর আগে, হাইকোর্ট একটি রিট পিটিশনের রায়ে মানবভোজ্য অ্যালকোহলকে মাদকদ্রব্য নয় বরং ‘অ্যালকোহল’ হিসেবে অভিহিত করার নির্দেশনা দিয়েছিল। এছাড়া সরকার ২০২২ সালে ‘অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২২’ প্রণয়ন করে পৃথক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর স্বীকৃতি দিলেও, বর্তমানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এখনো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর অধীনেই বহাল রয়েছে।


