ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার বিষয়টি প্রমাণিত হলে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন মেয়র শাহাদাত।
তিনি বলেন, ‘কোনো সাংবাদিক যদি প্রমাণ দিতে পারেন, ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা আমার গাড়িতে করে বেরিয়ে গেছে, তাহলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। আর এ ধরনের মিথ্যাচার করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবশ্যই মামলা করব।’
মঙ্গলবার রাতে নগর ভবনে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান এবং তাকে নিজের গাড়িতে করে বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বুধবার সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন।
মেয়র বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আমার নিজের কোনো বাড়ি নয়। এটা চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের জায়গা। এখানে মানুষ আসবে। সবাই তাদের অভিযোগ নিয়ে আসতে পারে। কেউ যদি এক্স, ওয়াই, জেড অভিযোগ নিয়ে আসে এবং সে যদি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হয়, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্ব।’
মেয়র বলেন, ‘আমি বারবার বলছি, সিটি করপোরেশন সবার। এখানে সবার জন্য দরজা খোলা। আমি কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর মেয়র নই। আমি সারা বাংলাদেশের, সারা চট্টগ্রামের আপামর জনসাধারণের মেয়র। এখানে অনেক দলের, অনেক মতের মানুষ আসে।’
ওয়াকিল হোসেন বগাকে নিজের রাজনৈতিক অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘বগা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী নয়। গত ১৭-১৮ বছর ধরে সে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল। জুলাই-আগস্টের একজন যোদ্ধাও সে। গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ তাকে ৭০-৮০টি মামলা দিয়েছে।’
এ সময় খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহিমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মেয়র। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ওসি আব্দুর রহিম বাকলিয়া থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তার প্রশ্ন, ওই সময়ের একজন ওসি কীভাবে এখন খুলশী থানায় দায়িত্ব পেয়েছেন।
মেয়রের অভিযোগ, খুলশী থানায় যোগ দেওয়ার পর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কোনো নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ওয়াকিল হোসেনের ভাইয়েরা ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে আসার পর থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
সম্প্রতি খুলশীতে হৃদয় নামের এক কিশোর হত্যার ঘটনায় পুলিশ ওয়াকিল হোসেন ও তার ভাইদের জড়ানোর চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন মেয়র।
তিনি বলেন, ‘হৃদয়ের হত্যাকারী কামরুলকে ওসি ও তার এসআই মিলে মারধর করে জোরপূর্বক ওয়াকিল এবং তার ভাইয়ের নাম বলতে বাধ্য করেছে। এরপর তাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে।’
মেয়রের দাবি, ওয়াকিলের দুই ভাই এ বিষয়ে অভিযোগ নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। খোরশেদ নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শীও একই কথা বলেছেন। এমনকি মামলার বাদীও বলেছেন, তারা কখনো কামরুলকে ওয়াকিলের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেননি।
নিজের গাড়িতে বগাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, তিনি কার্যালয় থেকে বের হয়ে সবার সামনে গাড়িতে উঠেছেন। ওই এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরাও রয়েছে।
‘আমি অফিস থেকে নেমে যখন গাড়িতে উঠি, সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। আমি লুকিয়ে গাড়িতে উঠিনি। সবার সামনে উঠেছি। কোনো সাংবাদিকের কাছেও ওয়াকিলের কোনো ছবি নেই। অনলাইন সাংবাদিক, যাদের কোনো রেজিস্ট্রেশনও নেই, তাদের বলতে চাই-এ ধরনের সাংবাদিকতা থেকে বের হয়ে সত্য কথা বলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার গাড়িতে যখন আমি উঠেছিলাম, তখন সে ছিল-এটা প্রমাণ করতে হবে। প্রমাণ করতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’
মেয়র দাবি করেন, তার কার্যালয়ে কেউ আশ্রয় নেয়নি। ওয়াকিলের ভাই সেখানে এসেছিলেন। এমনকি ওয়াকিল নিচে এসে থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্ব ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মেয়র বলেন, ‘আমি মনে করি এটা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। সামনে আমার নির্বাচন। যারা এখন ষড়যন্ত্র করছে, তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই ওসি অত্যন্ত পক্ষপাতমূলকভাবে এসব করছে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন মেয়র। তার দাবি, জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মেজবানের ডেকচিও ওই ওসি নিয়ে গিয়েছিলেন।
মেয়রের ভাষ্য, নির্বাচনের আগে তার ‘ভালো ইমেজ’ ক্ষুণ্ন করার জন্যই এসব করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে নগর ভবনের আশপাশে অবস্থান নেয় পুলিশ। নগর ভবনের ভেতরে ওয়াকিল হোসেন অবস্থান করছেন- এমন তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করতে সেখানে গেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মেয়রের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মেয়রকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা তো কাউকে খবর দিইনি, কেন এসেছেন আপনারা? কী জন্য আসছেন? সিটি করপোরেশনে ১০০ জন মানুষ আসবে।’
এ সময় মেয়রের অনুসারীদের বিরুদ্ধে নারী সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগ করতেও শোনা যায়।
পুলিশের দাবি, নগর ভবনের ভেতরে ও আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালানো হলেও ওয়াকিল হোসেনকে পাওয়া যায়নি। তবে অভিযানের সময় তিনি আদৌ নগর ভবনে ছিলেন কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াকিল হোসেন বগা নগরের খুলশী ও আশপাশের এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং কিশোর গ্যাংয়ের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। চাঁদাবাজি, মাদক, পুলিশের ওপর হামলা, বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে।
ওয়াকিল হোসেন নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি মেয়র শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
চলতি বছরের জুনে সরকারি জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর ৮ জুন তাকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এর আগে গত মাসে পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে তুলে নিয়ে মারধরের ঘটনায় করা মামলায় বগাকে প্রধান আসামি করা হয়। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তারে খুলশী এলাকায় অভিযান চালানোর সময় তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা ও সড়ক অবরোধের অভিযোগ ওঠে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলাতেও ওয়াকিল হোসেনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
খুলশী এলাকায় সাম্প্রতিক এক কিশোর হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও ওয়াকিল হোসেনের নাম সামনে এসেছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় হৃদয় নামের এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে আট কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ জানায়, সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘাত থেকে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিহত হৃদয় ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আটজন ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য। পুলিশের অভিযোগ, ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংটি ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা এবং রকিবুল ইসলাম ওরফে পিচ্চি পরিচালনা করেন।
অন্যদিকে স্থানীয় বিজয়, কামরান ও শান্তর নেতৃত্বে ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাং পরিচালিত হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।


