অসুস্থ, আহত নাকি মৃত্যুর মুখে? শুক্রবার এড়িয়ে চলাই ভালো

অসুস্থ, আহত নাকি মৃত্যুর মুখে? শুক্রবার এড়িয়ে চলাই ভালো
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে পায়ের মারাত্মক আঘাত নিয়ে ভর্তি আছেন নূর ইসলাম। তার পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত পেশি অস্ত্রোপচার করে ঠিক করা হয়েছে। প্রতিদিন এক জন ডাক্তার এসে তার ব্যান্ডেজ বদলে দিতেন। কিন্তু শুক্রবার সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেলেও কোনো ডাক্তারের দেখা মিলল না।

শুক্রবার বাংলাদেশে সরকারি ছুটি। এই দিন দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের অভিজ্ঞ বড় ডাক্তাররা ছুটিতে থাকেন। হাসপাতাল সামলানোর দায়িত্ব পড়ে শিক্ষানবিশ ও জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর। ফলে অস্ত্রোপচার, রোগীর যত্ন ও নিয়মিত চিকিৎসায় বেশ দেরি হয়ে যায়।

যারা বৃহস্পতিবার রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, শনিবারের আগে তাদের কপালে ভালো চিকিৎসা জোটে না বললেই চলে। এমনও দেখা গেছে, জরুরি অস্ত্রোপচারে দেরি হওয়ায় রোগী মারা গেছেন।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক গিয়াস ইউ আহসান টাইমসকে বলেন, ‘অসুখ-বিসুখ তো আর ক্যালেন্ডার দেখে আসে না। সরকার চাইলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ছুটির দিনেও পুরোদমে সেবা চালু রাখতে পারে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দায়িত্ব নিয়ে হাসপাতালগুলোতে হঠাৎ পরিদর্শন শুরু করার পর অবশ্য কিছু জায়গায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।

শুক্রবারেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তারদের বেশি উপস্থিতি দেখা গেছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে সেবার মান কিছুটা উন্নত হয়েছে, আর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের অবস্থা তুলনামূলক বেশ ভালো।

গত মে মাসে সরকারের একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, হাম রোগীদের চিকিৎসার জন্য ছুটির দিনেও হাসপাতাল পুরো চালু রাখতে হবে। কিন্তু পঙ্গু হাসপাতালের চিত্র আজও বদলায়নি।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নূর ইসলাম বললেন, ‘শুক্রবার কোনো বড় ডাক্তার আসেন না। মাঝে মাঝে শুধু এক জন নার্স এসে দেখে যান।’

ছুটির দিনে ভর্তি থাকা রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে নার্সদের ওপরই ভরসা করতে হয়। জরুরি বিভাগে ডাক্তার থাকলেও ওয়ার্ডের নিয়মিত চিকিৎসা ও রক্ত-প্রস্রাব বা এক্স-রে পরীক্ষার সুবিধা ছুটির দিনে খুব সীমিত।

এমনকি অন্য দিনের তুলনায় শুক্রবার নার্সদের সংখ্যাও কম দেখা গেছে।

পঙ্গু হাসপাতালে আসা বেশির ভাগ রোগীই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত। শুধু জরুরি বিভাগ দিয়ে এত রোগীর চাপ সামলানো অসম্ভব। ফলে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে অনেককে শনিবার পর্যন্ত চিকিৎসার অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়।

প্রতিদিন এত আহত রোগী আসার পরও ছুটির দিনে কেন সেবা সীমিত থাকে–জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মীর আনোয়ার হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘আমার চাকরি জীবনের শুরু থেকেই দেখে আসছি শুক্রবারের মতো ছুটির দিনে মূল চিকিৎসা সেবা বন্ধ থাকে। শুধু জরুরি বিভাগ খোলা রাখা হয়।’

শুক্রবার কি তবে মানুষের অসুস্থ হওয়া বন্ধ থাকে, নাকি চিকিৎসা বন্ধ রাখা উচিত—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সরকার আদেশ দিলে আমরা খোলা রাখব। তবে আমাদের লোকবলেরও অভাব আছে।’

আরও পড়ুন

অধ্যাপক গিয়াস আহসান মনে করেন, অনেক মানুষের জন্য শুক্রবারই ডাক্তার দেখানোর একমাত্র সুযোগ। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ সারা সপ্তাহ কাজ করে শুধু শুক্রবারে ছুটি পায়। অনেকের জন্যই এই দিনটি ডাক্তার দেখানোর একমাত্র সময়। তাই ছুটির দিনেও সেবা চালু রাখা উচিত।’

তিনি আরও জানান, বিশ্বের বহু দেশে সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টাই হাসপাতালের সেবা খোলা থাকে। এমনকি থাইল্যান্ডে সরকারি ছুটির দিনেও সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন।

ডাক্তারদেরও ছুটির প্রয়োজন আছে তা স্বীকার করে অধ্যাপক গিয়াস আহসান বলেন, পালাক্রমে ডিউটি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘যিনি শুক্রবারে কাজ করবেন, তাকে সপ্তাহের অন্য কোনো দিন ছুটি দেওয়া যেতে পারে। আসল দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও লোকবল ব্যবস্থাপনা। সুন্দর করে ডিউটির তালিকা করলে ছুটির দিনেও রোগীরা স্বাভাবিক সেবা পাবেন।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শুক্রবারে বড় ডাক্তারদের খুব একটা দেখা যায়নি। আউটডোরের টিকিট কাউন্টার বন্ধ ছিল এবং রক্ত বা এক্স-রের মতো পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়েছে। যদিও ছুটির দিনে সেগুলোতেও সব পরীক্ষা হয় না।

তবে ভর্তি রোগীদের জন্য ইন-ডোরে চিকিৎসা এবং জরুরি কিছু পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল। হাসপাতালের কর্মীরা জানান, এটা সাম্প্রতিক সময়ের একটা ভালো পরিবর্তন।

হবিগঞ্জ থেকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে এসেছেন রেহানা বেগম। তার দুই বছরের নাতির নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বাচ্চাটির অবস্থা খারাপ হলে তাকে ঢাকায় আনা হয়। জরুরি বিভাগের ডাক্তার তাকে দেখে বেশ কিছু পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও রেহানা বেগম হাসপাতালের ভেতরেই সব পরীক্ষা করাতে পেরেছেন।

রেহানা বেগম বলেন, ‘ছুটির দিনে হাসপাতালের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হলে বাড়তি টাকা আর সময় নষ্ট হতো।’

এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক শিশু হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় ভুগছে। রোগীর স্বজনেরা জানান, শুক্রবার হওয়া সত্ত্বেও সকালে ও বিকালে ডাক্তারের দল ওয়ার্ডে এসে রোগী দেখে গেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ভালো তৎপরতা দেখা গেছে। শুক্রবারে শিক্ষানবিশ ডাক্তারদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ তিন-চারজন ডাক্তার প্রতিটি ওয়ার্ডে ডিউটি করেছেন এবং নিয়মিত রোগী দেখেছেন।

এক জন ডাক্তার জানান, ছুটির দিনে তাদের তালিকা অনুযায়ী ডিউটি করতেই হয়। তিনি বলেন, ‘সারা দেশ থেকে ঢাকা মেডিকেলে রোগী আসেন, তাই এখানে কাজের চাপ সব সময় বেশি। ছুটির দিনেও ঢিলেমি দেওয়ার সুযোগ নেই।’

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন টাইমসকে বলেন, দু-একটি হাসপাতাল দেখে সারা দেশের চিত্র বিচার করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ‘ছুটির দিনে সব হাসপাতালেই নিয়মিত কাজকর্ম সীমিত রাখা হয়, তবে জরুরি বিভাগ চালু থাকে। কতজন ডাক্তার ডিউটিতে থাকবেন এবং তারা সিনিয়র না জুনিয়র হবেন, তা ঠিক করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।’

চিকিৎসা একটি জরুরি সেবা, তাই এটি সপ্তাহে সাত দিনই খোলা রাখা উচিত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, জটিল কোনো কেস হলে জুনিয়র ডাক্তাররা ফোনে সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, রোগীর সংখ্যার তুলনায় কতজন ডাক্তার দরকার, তা হাসপাতালের নিজস্ব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়।

আর এই সমস্যা শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্রও প্রায় একই।

সেখানেও ছুটির দিনে বড় ডাক্তাররা ছুটিতে থাকেন আর হাসপাতাল সামলান জুনিয়ররা। ছুটির দিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও পিছিয়ে যায়।

হাসপাতালে সেবা কমে গেলেও শুক্রবারে ডাক্তারদের তাদের নিজস্ব চেম্বারে বেশি রোগী দেখতে দেখা যায়। অনেকেই ছুটির দিনে ঢাকা ছেড়ে জেলা শহরে গিয়ে রোগী দেখেন।

সরকার অবশ্য মাঝে মাঝে পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। গত মে মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা বাড়লে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ছুটির দিনেও ডাক্তারদের হাসপাতালে উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়।

১৯ মে জারি করা সেই আদেশে বলা হয়, ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল-বিকাল বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের অবশ্যই ওয়ার্ডে ঘুরে রোগী দেখতে হবে।

একই সঙ্গে প্রতিটি বিশেষায়িত বিভাগে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা চালু রাখার মতো লোকবল রাখার কথা বলা হয়।

এখনো দেশে প্রতিদিন হামে মানুষ মারা যাচ্ছে, আর ডেঙ্গুর প্রকোপও বেড়েছে। এমন সময়ে চিকিৎসায় সামান্য দেরিও রোগীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

গত আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সারা দেশের সরকারি হাসপাতাল তদারকির জন্য ৬৯ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়। ডাক্তারদের উপস্থিতি, ডিজিটাল হাজিরা, হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও যন্ত্রপাতির অবস্থা তদারক করাই তাদের কাজ। তবে সেই তদারকি পরিকল্পনাতেও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad