ভোরের আলো ফোটার আগেই দুই বছরের মেয়ে সামায়রার কান্নায় ঘুম ভাঙে কল্যাণপুরের বাসিন্দা সানজিদার। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শান্ত করার মধ্য দিয়েই শুরু হয় তার দিনের ব্যস্ততা। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী সানজিদার বাকি দিন কাটে সংসারের অন্তহীন কাজে।
সকালে বিছানা ছেড়ে সানজিদা পা রাখেন রান্নাঘরে। স্বামীর জন্য নাশতা তৈরি করে তা পরিবেশন করা হলো তার প্রথম কাজ। এই সময় অফিসগামী স্বামীর পোশাক এগিয়ে দিতে হয়। প্রস্তুত রাখতে হয় ঘড়ি, ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও। এমনকি স্বামী যেন নির্বিঘ্নে অফিসের কাজ করতে পারেন সেজন্য তার দুপুরের খাবারটিও গুছিয়ে সঙ্গে দিয়েন সানজিদা।
নাস্তা শেষ করে রান্নাঘর পরিষ্কার করেন, শ্বাশুড়িকে ঘরের কাজে সাহায্য করেন এবং দুপুরের মধ্যেই কাপড় ধোয়া শেষ করেন।
সন্ধ্যা নামতেই মেয়েকে পড়াতে বসান। সেইসঙ্গে চলে রাতের রান্না। রান্না-খাওয়া শেষে সব ধুয়ে-মুছে রাখেন। খেয়ে-দেয়ে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লেই শেষ হয় সানজিদার একদিনের কর্মযজ্ঞ। দিনভর এতকিছু করলেও এগুলোকে ‘কাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। এসবকিছুই সানজিদার কর্তব্য বা দায়িত্ব। পরদিন সকাল থেকে যে কাজের চক্র আবার শুরু হবে।
সানজিদার এই গল্প নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের কোটি কোটি নারী একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে রোজ যান। পরিবার চালিয়ে নিতে এবং আরও বৃহত্তর পরিসরে বলতে গেলে দেশের অর্থনীতি চালিয়ে নিতে নীরবে কাজ করে যান তারা। কিন্তু দিনশেষে তাদের শ্রমকে ‘সত্যিকারের কাজ’বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ‘আমরা গৃহস্থালীর কাজকে কাজ হিসেবে দেখি না। ফলে নারীরা সময়ের অভাবে পিছিয়ে পড়ে, চাকরিতে এগোতে পারে না এবং এই কাজকে নিজের কর্তব্য বলে মনে করে।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈতনিক গৃহস্থালী ও যত্নের কাজের মূল্য ৬ দশমিক ৭ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। নারীরা এতে অবদান রাখেন ৩ দশমিক ৪ লাখ কোটি টাকা। তবুও এই কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই।
বিবিএসের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব কাজকে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, শিশু ও প্রবীণদের যত্নে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হবে এবং নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও ঘরের কাজ ভাগ করে নিতে উৎসাহ দিতে হবে। এই অদৃশ্য শ্রম যেন নারীদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করতে পারে সেজন্য এই কাজের স্বীকৃতি, পুনর্বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার কথাও সেখানে উঠে এসেছে।
অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ‘গৃহস্থালী কাজেরও মূল্য আছে। যদি এই কাজের স্বীকৃতি মেলে এবং পুরুষদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয় তাহলে পুরুষদেরও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে। গৃহস্থালীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন এবং যত্নখাতে বিনিয়োগ করলে সমাজের উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ হতে পারে। সেই সঙ্গে কমতে পারে সহিংসতা।’
শহরের কর্মরত নারীদের জন্য সংগ্রাম অনেক কঠিন। সারাদিন অফিস করে যানজট ঠেলে বাড়ি ফিরে আবার সংসারের সব কাজ করতে হয়।
ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি অফিসে কর্মরত যুঁথি বলেন, ‘বাইরের কাজ শেষে বাড়ির সব কাজ একা করা কঠিন। অন্য কাজের জন্য সময় মেলানো যায় না। যার কারণে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয় এবং অফিসের কাজেও তার প্রভাব পড়ে।’
গ্রামীণ এলাকায় নারীর কাজের চাপ আরও বেশি। নারীরা রান্না করেন, ঘর গুছান, বাইরে থেকে পানি সংগ্রহ করেন, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং ক্ষেতের কাজ করেন। তবুও তাদের বলা ‘গৃহিণী’, ‘কর্মী’ নয়।
এতসব কাজের ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপে থাকেন। বিশ্রামের সময় পান না। ফলে ক্লান্তি, হতাশা, শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথাসহ সব সমস্যার মধ্যে দিয়েই তাদের যেতে হয়।
দেখা যায়, মায়ের সাংসারিক কাজে সাহায্য করতে অনেক পরিবারেই মেয়েশিশুদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়। আর এই প্রক্রিয়া দিনের পর দিন চলতেই থাকে।
ঘরের কাজে অসমতাকে নারীর অগ্রগতির পথে অন্যতম বাধা হিসেবে দেখা হয়। অনেক পুরুষই আছেন যারা আশপাশের মানুষের উপহাসের ভয়ে ঘরের কাজে অংশ নেন না।
একজন তরুণ পিতা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করলে, আমার বন্ধুরা তা নিয়ে হাসাহাসি করে।’
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘরের কাজে অংশগ্রহণে পুরুষের এই দূরত্বকে এখন স্বাভাবিক বলেই ধরে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের মায়েরা, বোনেরা, মেয়েরা ঘরে অনেক কাজ করেন, কিন্তু সেটা কখনো মূল্যায়ন করা হয় না। একজন নারী যদি টাকা না উপার্জন করে, তবে ধরে নেয়া হয় সে কিছুই করে না অথচ তার এই কাজ করার জন্য অন্য কাউকে ভাড়া করলে তার সুস্পষ্ট বাজারমূল্য আছে।’
তিনি বলেন, ‘অবৈতনিক কাজ নারীদের উপর বড় এক বোঝা তৈরি করে। এটি ভাগাভাগি ও পুনর্বণ্টন না হলে তারা এগোতে পারবে না।’
বিবিএস এবং ইউএন উইমেনের একটি জরিপের প্রথম ধাপ, এই লুকানো শ্রমকে সামনে আনে।
বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের বনশ্রী মিত্র বলেন, ‘বিবিএসের রিপোর্টে নারীদের অবৈতনিক কাজ ও তার অর্থনৈতিক মূল্য দেখানো হয়েছে, তবে এটি এখনো জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত নয়। আমরা অর্থনীতিবিদদের স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে বলছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গৃহস্থালী কাজ শুধুই নারীদের দায়িত্ব নয়। পুরুষকেও দায়িত্ব ভাগ করতে হবে, রাষ্ট্রকে শিশু যত্ন ও সেবা ব্যবস্থায় সহায়তা দিতে হবে যাতে নারীরা পুরোপুরি কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। স্বীকৃতি এবং পুনর্বন্টন ছাড়া নারীরা অগ্রসর হতে পারবে না বা বিকশিত হতে পারবে না।’
সানজিদার মতো অগণিত গৃহিণীর কাছে তাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এখনো অনেক দূরের স্বপ্ন। প্রতিদিনের অবৈতনিক শ্রমের পর তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যন্ত হয়ে পড়েন। এমন কাজের জন্য তারা অসুস্থ হন, যার কোনো আর্থিক মূল্য বা স্বীকৃতি নেই।
অথচ তাদের এই কাজেই টিকে থাকে পুরো পরিবার, দেশের অর্থনীতিও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বীকৃতি, কাজের পুনর্বণ্টন ও পরিবারের সহায়তা থাকলে এই অদৃশ্য শ্রম প্রাপ্য সম্মান পেতে পারে এবং সূচনা করতে পারে সমতার এক নতুন পথের।


