আজ ৩ আগস্ট। ঠিক ৭০ বছর আগে এই দিনে ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল প্রেক্ষাগৃহে পর্দা উঠেছিল একটি ছবির— ‘মুখ ও মুখোশ’। বাংলাদেশের মাটিতে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র এটি।
স্বাধীনতার পূর্বে স্থানীয় প্রেক্ষাগৃহগুলোতে দেখানো হতো কলকাতা বা লাহোরে তৈরি ছবি। এই বাস্তবতার বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছিলেন নাট্যকার ও অভিনেতা আবদুল জব্বার খান। পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক এফ. দোসানি একসময় মন্তব্য করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের আর্দ্র আবহাওয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়। এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে জব্বার খান চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন—তিনি ছবি করে দেখাবেন। সেই জেদ থেকেই ১৯৫৩ সালে শুরু হয় ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কাজ।
১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে গাজীপুরের কালীগঞ্জে প্রথম শুটিং হয়। এরপর রাজারবাগের কৃষিক্ষেত্র, কমলাপুরের বৌদ্ধমন্দির এলাকা, লালমাটিয়ার ধানখেত, মিরপুর, তেজগাঁওয়ের জঙ্গল, জিঞ্জিরা ও টঙ্গীর নানা প্রান্তে চলে চিত্রগ্রহণ। মাত্র একটি আইমো ক্যামেরা, একটি সাধারণ টেপ রেকর্ডার আর একটি জেনারেটর দিয়েই তৈরি হয় গোটা ছবি। স্থানীয়ভাবে কোনো ফিল্ম প্রসেসিং স্টুডিও না থাকায় নেগেটিভ পাঠাতে হয়েছিল লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে। শুটিং শেষ হয় ১৯৫৫ সালের ৩০ অক্টোবর।
‘মুখ ও মুখোশ’-এর কাহিনির উৎস ফরিদপুরের একটি ডাকাতির ঘটনা। যেটি অবলম্বনে আবদুল জব্বার খান লেখেন নাটক ‘ডাকাত’। একই নামে ছবি বানাতে চাইলেও, কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের পরামর্শে তা বদলে হয় ‘মুখ ও মুখোশ’। মানুষের বাহ্যিক পরিচয় আর ভেতরের সত্তার দ্বন্দ্ব—এমন ভাবনায় নামকরণ।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নারী অভিনয়শিল্পী খুঁজে পাওয়া। পঞ্চাশের দশকে অভিনয়ে আগ্রহী নারীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা, ফলে জব্বার খান প্রথমে ভেবেছিলেন মঞ্চনাটকের প্রথা মেনে পুরুষকেই নারীর ভূমিকায় নামাবেন। শেষ পর্যন্ত সাপ্তাহিক চিত্রালী পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে খোঁজ মেলে অভিনয়শিল্পীর। ইডেন কলেজের ছাত্রী পিয়ারী বেগম নাজমা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জহরত আরা এগিয়ে আসেন। প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেন চট্টগ্রামের পাথরঘাটার পূর্ণিমা সেনগুপ্তা। প্রধান পুরুষ চরিত্রে ছিলেন ইনাম আহমেদ, দ্বিতীয় প্রধান চরিত্রে খোদ পরিচালক আবদুল জব্বার খান নিজেই। প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীই পারিশ্রমিক ছাড়া কাজ করেছিলেন।
সংগীত পরিচালনায় ছিলেন সমর দাস, গান লিখেছিলেন জব্বার খানের বন্ধু এম এ গফুর (সারথী), আর কণ্ঠ দিয়েছিলেন আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসনাত। সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন আবদুল লতিফ।
আবদুল জব্বার খান ছিলেন মূলত মঞ্চনাটকের মানুষ। ছবিটি নির্মাণের সময় তার হাতে না ছিল পুঁজি, না ছিল প্রশিক্ষিত কলাকুশলী। ইকবাল ফিল্মসের নুরুজ্জামান অর্থায়নে এগিয়ে আসেন। ছবি শেষ হওয়ার পরও প্রথমে ঢাকায় ফেরার অনুমতি মেলেনি, ফলে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর প্রথম প্রদর্শনী হয় পাকিস্তানের লাহোরে। ঢাকায় ফেরার পরও প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের কাছ থেকে সাড়া মেলেনি সহজে। তবে ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনায় একযোগে মুক্তির পর ছবিটি ঘিরে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়। ছবিটি নির্মাণে খরচ হয়েছিল ৬৪ হাজার রুপি, আয় হয়েছিল ৪৮ হাজার রুপি। ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক না হলেও ইতিহাসে এর স্থান পাকা হয়ে যায়।
‘মুখ ও মুখোশ’-এর সবচেয়ে বড় অবদান এই প্রমাণ করা যে, বাংলাদেশের মাটিতেও পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র সম্ভব। এই ছবির হাত ধরেই তৈরি হয় ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রির ভিত্তি। এর কিছুকাল পরই, ১৯৫৭ সালে সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (পরবর্তীতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন তথা এফডিসি)।
‘মুখ ও মুখোশ’ যে স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তার লক্ষ্য ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, শিল্পমানসম্পন্ন ও বাণিজ্যিকভাবে টেকসই চলচ্চিত্র শিল্প—যা নিজস্ব গল্প বলবে, নিজস্ব দর্শক তৈরি করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জায়গা করে নেবে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক উৎসবে মাঝেমধ্যে সমাদৃত হলেও দেশের ভেতরে দর্শক ফেরানো, প্রেক্ষাগৃহ পুনরুজ্জীবিত করা আর টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করার লড়াই এখনো শেষ হয়নি।


