স্কুল পালানো কিশোর এখন বহুজাতিক করপোরেট লিডার

স্কুল পালানো কিশোর এখন বহুজাতিক করপোরেট লিডার
Advertisement
Advertisement

নদী ভাঙনের শব্দ আর মাছ ধরার নেশায় মজে থাকা এক কিশোর। যার কাছে গণিত ছিল এক বিভীষিকার নাম। এতটাই যে, অংকের ভয়ে ২০০৩ সালে অষ্টম শ্রেণিতে থাকতেই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সেই কিশোরই আজ একটি ব্রিটিশ বহুজাতিক কোম্পানির দক্ষিণ এশিয়ার আর্থিক পরিকল্পনা ও বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান। সেই প্রতিষ্ঠানের মরিশাসের ব্যবসা-বাণিজ্যও সামলাচ্ছেন।

বলছি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজিমপুর গ্রামের সন্তান আশ্রাফ উল্যার কথা। একসময়ের ‘স্কুল ড্রপআউট’ থেকে আজ করপোরেট জগতের এক সফল নেতৃত্ব—তার এই রূপান্তর যেন কোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।

যখন গণিত ছিল এক আতঙ্কের নাম

সন্দ্বীপের আজিমপুর গ্রামে নদী ভাঙনে জমি হারানো এক পরিবারে দশ সন্তানের মধ্যে অষ্টম আশ্রাফ। বাবা আনিস উল্যা ছিলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য। অভাব আর অনিশ্চয়তার মাঝে বড় হওয়া আশ্রাফের মন বসত না বইয়ের পাতায়। বিশেষ করে অংকের যন্ত্রণায় ক্লাসে উত্তীর্ণ হতে হতো বিশেষ বিবেচনায়। বই পড়ার চেয়ে মেঘনার লোনা জলে মাছ ধরাই ছিল তার পছন্দের কাজ। ফলে ২০০৩ সালে পড়াশোনায় ইতি টেনে দেন তিনি।

মোড় ঘুরিয়ে দিল একটি সুযোগ

ছেলের এমন বিমুখতা মেনে নিতে পারেননি বাবা। ২০০৪ সালে তাকে নতুন করে ভর্তি করিয়ে দেন মুছাপুর হাজী আব্দুল বাতেন উচ্চ বিদ্যালয়ে। বড় বোনের বাড়িতে থেকে শুরু হয় নতুন লড়াই। সেখানে ভাগিনা এবং শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা যেন জাদুর মতো কাজ করল। যে ছেলে অংক দেখে পালাত, সেই ছেলেই দশম শ্রেণিতে গণিতে ৭০-এর বেশি নম্বর পেয়ে ক্লাসে পঞ্চম হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। পুরো স্কুলে ছড়িয়ে পড়ল তার নাম।

সাফল্যের জয়যাত্রা

আরও পড়ুন

এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি আশ্রাফকে। ২০০৬ সালে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং দুই বছর পর এইচএসসিতেও একই ঈর্ষণীয় ফলাফল করেন। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় দেখান অভাবনীয় সাফল্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গ’ ইউনিটে ১৬তম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেন। শেষে বেছে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগকে।

আশ্রাফ উল্যা টাইমস অব বাংলাদেশে’র কাছে বলেন, “আমরা প্রায়শই নিজের মেধা সম্পর্কে বুঝতে পারি না। কারণ আমরা চেষ্টা করি না।”

করপোরেট ক্যারিয়ারে উত্থান

স্নাতক শেষ হওয়ার আগেই সুযোগ পান রবি আজিয়াটা লিমিটেডে। সেখানে সাড়ে তিন বছর কাজ করার পর এসিআই-তে অভিজ্ঞতা ঝালাই করে নেন। ২০১৮ সালে যোগ দেন বিশ্ববিখ্যাত ব্রিটিশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারটেক’-এ। বর্তমানে তিনি ভারতের দিল্লিতে প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক সদর দফতরে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

বিসিএস নয়, লক্ষ্য ছিল পেশাদারিত্ব

অনেকের মতো বিসিএস বা সরকারি চাকরির মোহে ছোটেননি আশ্রাফ। এমনকি রাজনীতিও তাকে টানেনি। তার লক্ষ্য ছিল অর্জিত শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, সেই স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। সাফল্যের এই দীর্ঘ পথে তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন শিক্ষক গোলাম মর্তুজা রানা, দিদার, হাশেম, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার খান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং অবধারিতভাবে বড় বোনের কথা। প্রাইম ব্যাংক ফাউন্ডেশনের বৃত্তিসহ বিভিন্ন আর্থিক সহায়তাও তার লড়াইকে সহজ করেছিল।

শেষ কথা

নদী ভাঙা পরিবারের সেই ব্যাকবেঞ্চার আজ দক্ষিণ এশিয়ার করপোরেট টেবিলের সামনের সারিতে। আশ্রাফ উল্যার এই গল্প আমাদের শেখায়, সঠিক মেন্টর আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে জীবনের যেকোনো ‘ড্রপআউট’ অধ্যায় থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad