দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছুঁইছুঁই

দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছুঁইছুঁই
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা গত এক বছরে বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার। আর এতে দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জনে।

সোমবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৬ হাজার ১০৭ জন। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৫৭ জন।

এই সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুরা। সেই সঙ্গে রয়েছে নতুন করে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারাও।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে মূলত দুইটি কারণ রয়েছেভ শরণার্থী শিবিরে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর জন্ম এবং মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের কারণে নতুন করে কিছু রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এসব নবাগত ও নবজাতকদের তথ্য নিবন্ধনের মাধ্যমে হালনাগাদ করছে।’

বাংলাদেশ সরকার সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের টেকসই সমাধান হচ্ছে মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।’

ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে নতুন করে আগত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন। একই সময়ে শিবিরগুলোতে ৩৪ হাজার ৩০১ জন শিশু জন্ম নিয়েছে।

আরও পড়ুন

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও সহিংসতার কারণে নতুন করে বহু রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর ফলে অনেক পরিবার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

নতুন আগতদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে শনাক্ত করা হলেও অনেককে এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে নিবন্ধিত শরণার্থী হিসেবে গণ্য করা হয়নি। তাদেরকে মানবিক সহায়তা বিতরণের জন্য পরিবারভিত্তিক পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।

হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিবারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৫টি। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৩০৩টি।

অর্থাৎ এক বছরে ৪১ হাজার ৯১২টি পরিবার বেড়েছে। প্রতিবেদনে নতুন আগত পরিবার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৯৫৫টি।

তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সাল থেকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার ৫০২ জন। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর ২০১৭ সালের আগস্টের পর ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরগুলোর একটি গড়ে উঠেছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে মানবিক সহায়তা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব কেবল মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে। তবে দেশটিতে চলমান অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের কারণে সেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনো অনিশ্চিত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আক্কাস আহমদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট দিন দিন শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে শরণার্থী শিবিরে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস স্থানীয় পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। তাই এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা এবং মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বাস্তব উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারের উচিত এই সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক মহলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত প্রত্যাবাসনের বাস্তব প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।

পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা, শরণার্থী শিবিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্থানীয় জনগণের ওপর যাতে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad