ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবগঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় এক ধরনের বৈচিত্র্যও রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন।
নিউইয়র্কভিত্তিক বাংলা গণমাধ্যম ঠিকানা আয়োজিত সংলাপে তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, এবার তাদের মন্ত্রী করা হয়নি। বিপরীতে তখন যারা ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাদের এবার রাখা হয়েছে। আবার নতুন অনেককে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে, যারা আগে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। এভাবে বিভিন্ন প্রজন্মকে নিয়ে সরকার, এটা কিন্তু ভালো দিক।’
‘ডেটলাইন ঢাকা: কেমন সরকার পেলাম’- শিরোনামে ঠিকানার এই সংলাপ হয় বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে ১২টায় (নিউইয়র্ক সময় রাত দেড়টা)। রাজধানী ঢাকা থেকে যা সরাসরি সম্প্রচারিত হয় ঠিকানার সব ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে। এতে অতিথি হিসেবে আরো ছিলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিন, আপিল বিভাগের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ। সংলাপ আয়োজনটির সঞ্চালনায় ছিলেন ঠিকানা টিভির প্রধান সম্পাদক খালেদ মুহিউদ্দীন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ: বিএনপির অনীহা কেন?
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপির প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন মঙ্গলবার। কিন্তু তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। জামায়াত ও এনসিপির বিজয়ীরা দুটি পদের জন্যই শপথ নিয়েছেন। বিএনপির এমন অবস্থানের সমালোচনা করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম।
তিনি বলেন, গণভোট হবে, একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে- এসব বিষয় সব দলই জানত। সেক্ষেত্রে এগুলো নিয়ে যথাযথ আইন করা হয়েছে। বিএনপি জুলাই সনদে সই করা দল। তারা এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিষয়টি জানে না, এটা হতে পারে না।
তার এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন জানিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আবার একটি শপথ নেওয়া- এতে সংবিধান অবমাননার ঘটনা ঘটতো। সংবিধানের মর্যাদা সমুন্নত রাখার জায়গা থেকেই বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি।
বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার বিষয়টি হঠাৎ করেই অন্য দলগুলোকে জানিয়েছে, এমন অভিযোগ করেন হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি আগেই বিরোধীদলের নেতাদের জানাতেন যে, সংবিধানে যুক্ত করার পর সব দল মিলে দ্বিতীয় পদটিতে শপথ নিলে ভালো হবে। তখন অন্য কেউ দ্বিমত করতো না, মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি সংসদে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়ে এখন অবস্থান পরিবর্তন করছে। তারা যদি এখন বলে গণভোট সংবিধানসম্মত নয়, তাহলে কিছু করার থাকবে না অন্য দলগুলোর। আসলে এতো সংবিধান দেখালে, আইন দেখালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানই অসাংবিধানিক ব্যাপার হয়ে যায়।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রী হলেন খলিলুর রহমান: এই নিয়োগের কারণ কী?
অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নতুন সরকারের এটা বড় চমক বলে মনে করেন অতিথিরা। কারণ একসময় এই উপদেষ্টারই পদত্যাগ দাবি করেছিলেন বিএনপি নেতারা। এখন পুরো বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী? এমন প্রশ্নে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, রাজনীতি আসলে স্থির কিছু নয়। প্রথমে একরকম মনে হলেও পরে দেখা গেছে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ড. খলিল অনেক কাজ করেছেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে কূটনীতি, সেখানে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন।
একই বিষয়ে আপিল বিভাগের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ড. খলিলের পেশাদার জীবনে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। তিনি হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিজের দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দক্ষতার সঙ্গে হয়তো বিএনপির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতে পেরেছেন। যার জন্য তিনি পুরস্কৃত হলেন নতুন ক্যাবিনেটে জায়গা পেয়ে।
কূটনীতির কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি ড. খলিলকে কাজে লাগাতে চায়, এমনটি হতে পারে বলে মনে করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিন। তার ভাষ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকার অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিল। সেই অস্বাভাবিকতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপার আছে। বিগত সময়ে কূটনীতির দর কষাকষিতে ভূমিকা রেখেছিলেন হয়তো ড. খলিল। এ বিষয়গুলো এখনো রয়ে গেছে। সেই চ্যালেঞ্জ নিজে নিতে চায় না বিএনপি। তাই খলিলুর রহমানকে নিয়োগ দিয়েছে তারা।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে মনযোগ দিয়েছিল। তাদের সময়ে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো ছিল না। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ছিল নাজুক। বিএনপি সরকারকে এগুলোর ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজ করতে হবে, মন্তব্য করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিন।
তিনি আরো বলেন, ‘ড. ইউনূস সরকারের আমলে সাংবাদিকদের প্রতি সরাসরি হুমকি ছিল না। রাষ্ট্রের দিক থেকেও খবরদারি কম ছিল। কিন্তু অনলাইন মব তৈরি করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের প্রবণতা লক্ষণীয় ছিল। বট বাহিনীর অপতৎপরতা ছিল অনলাইনে। এটা যদি এখনো থাকে, তবে প্রকৃত সাধারণ মানুষের মতামত কিন্তু আমরা জানতে পারবো না। সেখান থেকে আমাদের বের হতে হবে।’
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশার জায়গা থেকে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ যেটা চায়, সেটা হচ্ছে আইন দ্বারা সে নিপীড়িত হবে না। নতুন সরকারের কাছে আশা করবো, মানুষের এই আকাঙ্খা যাতে পূরণ হয়।’
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে যে লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি হয়, সেটা যদি বিএনপি সরকার শুরু থেকেই বন্ধ করে, তাহলে মানুষ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। এই সরকার অনেক দূর যেতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।


