রাষ্ট্র পরিচালনায় যুবকদের প্রাধান্য, নারীদের নিরাপত্তার বিধান, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ফ্যাসিস্ট প্রথা বিলোপসহ ২৬টি বিষয়কে বিশেষ প্রধান্য দিয়ে ৪১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী।
রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে বিদেশি কূটনীতিক এবং দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির আমির শফিকুর রহমান।
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার।’
একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ‘চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে ইশতেহারে ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে পাঁচটি ‘হ্যাঁ’ এবং পাঁচটি ‘না’ রয়েছে। হ্যাঁ-এর মধ্যে রয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। না-এর মধ্যে আছে- দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।
ইশতেহার ঘোষণার সূচনা বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে। বিগত ১৫ বছরে এমন কোনো শ্রেণি-পেশার লোক নেই যে নিপীড়নের শিকার হয়নি। কিন্তু বিগত ৫ আগস্টের পর আমরা ভুলে গেছি অনেকে। যদি আমরা আগেরদিন স্মরণ করতাম, তাহলে জুলাইযোদ্ধাদের বুকে ধারণ করতাম। ফ্যাসিস্ট চলে যাওয়ার পর কেউ এসেছে বাংলাদেশকে গড়তে। আবার কেউ নিজের ভাগ্য গড়তে এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা আমার চরিত্র হননের চেষ্টা করেছেন তাদের আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। আমাদের চরিত্র ও রক্তের সঙ্গে প্রতিশোধ শব্দটা যায় না। আমরা জামায়াতের বিজয় চাই না। আমরা জাতির বিজয় চাই।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘৪৭ না হলে ৭১ হতো না, ৭১ না হলে ২৪ পেতাম না। একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত। ইশতেহার কেবল দলীয় কর্মসূচি নয়, বরং এটি জাতির প্রতি দলের পরিকল্পপনা, একটি জীবন্ত দলিল।’
ইশতেহারের প্রথম ভাগে বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে শাসনব্যবস্থার সংস্কার, কার্যকর জাতীয় সংসদ, নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং উন্নত আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে আত্মনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। বাণিজ্য, শিল্প, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে।
এ ছাড়া কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানোন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং যুব নেতৃত্বের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নারী ও শিশু নিরাপত্তা, সমাজকল্যাণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছে, ‘জনতার ইশতেহার’ তৈরিতে অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে এবং জনগণের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চাহিদা বিবেচনা করে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।’
ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:
১. ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন।
২. বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন।
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রাধান্য দেওয়া।
৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন।
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
৬. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন।
৭. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূলো আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ।
৮. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খ্যাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই এবং স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ।
৯. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা।
১০. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এবং মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা।
১১. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন।
১২. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও কৃষকদের সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি।
১৩. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা ও বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়া।
১৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে ব্যাপক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
১৫. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
১৬. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিত করা এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
১৭. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিভাজনের পরিবর্তে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা।
১৮. আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
১৯. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা।
২০. দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থান।
২১. যাতায়াত ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করে রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক ও রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই থেকে তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা এবং আঞ্চলিক ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা।
২২. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসন নিশ্চিত করা।
২৩. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের পুনর্জন্ম রোধ করা।
২৪. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন নিশ্চিত করা এবং পর্যায়ক্রমে সব নাগরিককে আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা।
২৫. সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে সুশাসনের মাধ্যমে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।


