শিশুকে দ্রুত হাঁটতে সাহায্য করবে–এমন আশা থেকে অনেক অভিভাবক ওয়াকারের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু শিশু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই যন্ত্র শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করে এবং গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
শুক্রবার ঢাকার শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে এসব কথা তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশুর জন্য সুস্থতা সংগঠনের উদ্যোগে, হাসপাতাল এবং ফ্রেন্ডস প্লাসের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বক্তারা বলেন, বেবি ওয়াকার শিশুকে দ্রুত হাঁটতে সাহায্য করে–এ ধারণা ভুল। লন্ডনের সাউথওয়ার্ক প্রাইমারি কেয়ারের ২০০২ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ওয়াকার ব্যবহারকারী শিশু অন্যদের তুলনায় ১১ থেকে ২৬ দিন দেরিতে হাঁটতে শেখে।
তুরস্কের ২০২০ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, এটি শিশুর মেরুদণ্ডের ভারসাম্য গঠনে বাধা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেশনওয়াইড চিলড্রেনস হাসপাতালের তথ্যমতে, ওয়াকারজনিত আঘাতের ৯১ শতাংশ মাথা বা মুখে লাগে। ওহাইওর কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির গবেষণায় আরও বলা হয়, এটি শিশুর বুদ্ধি বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বেবি ওয়াকারে থাকা শিশু প্রতি সেকেন্ডে তিন থেকে চার ফুট গতিতে চলতে পারে, ফলে দুর্ঘটনা হঠাৎ ঘটে এবং তা ঠেকানো কঠিন হয়ে যায়।

১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার শিশু বেবি ওয়াকার-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে।
২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে আটজন শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এসব ঝুঁকির কারণে কানাডা ২০০৪ সালে বেবি ওয়াকারের উৎপাদন, বিক্রয় ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করেছে।
ভুটানও ২০২৪ সালে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্সসহ পেশাজীবী সংগঠনগুলোও নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুল হক বলেন, ‘বেবি ওয়াকার শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ–বসা, হামাগুড়ি, দাঁড়ানো, হাঁটা–এই ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটায়। এটি শিশুর নড়াচড়া ও ভিজুয়াল-মোটর সমন্বয় ব্যাহত করে।
তিনি অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. কবিরুল ইসলাম বলেন, অনেক শিশু মুখ-মণ্ডলে আঘাত নিয়ে আসছে, যেগুলোর সঠিক সেলাই না হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এসব ক্ষত প্রায়ই প্লাস্টিক সার্জারির মতো সূক্ষ্ম সেলাইয়ের প্রয়োজন পড়ে।
এমনকি ছোট ক্ষতেও কখনো অ্যানেস্থেশিয়ার প্রয়োজন হয়, যা অভিভাবকরা নিতে দ্বিধা করেন। আবার অনেক শিশু খেয়ে আসায় অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার আগে অপেক্ষা করতে হয়। আগের চিকিৎসা ভুল হওয়ায় জটিলতা তৈরি হওয়াও সাধারণ ঘটনা।
অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, খালি পায়ে বা প্রাকৃতিক মাটিতে হাঁটা শিশুরা তুলনামূলক দ্রুত হাঁটতে শেখে, আর মসৃণ মেঝে বা জুতা পরে হাঁটলে দেরি হয়–যদিও এটি তাঁর পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক দাবি নয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান স্কুলের পাঠ্যক্রমে শিশুর নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতা যুক্ত করার আহ্বান জানান।
অভিভাবক মেহেদি মাসুদ, ফারিয়া তাজরিন ও রাফিয়া জাহান বেবি ওয়াকার ব্যবহারের কারণে সন্তানদের দুর্ঘটনা ও জটিলতার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শাকিল আহমেদ। এতে অধ্যাপক ডা. আব্দুল হানিফ টাবলুসহ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগীয় শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।


