রংপুরে শিক্ষকদের ধর্মঘটে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ থাকায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তবে সরকারি নির্দেশনা মেনে জেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা চলছে। মাধ্যমিক স্কুলের প্রতিষ্ঠান প্রধানরা জানিয়েছেন, সহকারী শিক্ষকদের অসহযোগিতার কারণে তারা পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে পারছেন না।
মঙ্গলবার রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও রংপুর জেলা স্কুলে পরীক্ষা দিতে এসে শিক্ষার্থীদের ফিরে যেতে দেখা গেছে। তাদের সঙ্গে থাকা অভিভাবকদেরও স্কুল গেটে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে মাধ্যমিকের শিক্ষকরা ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ রেখে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
এর আগে সোমবার রাতে পরীক্ষা চালু রাখার প্রজ্ঞাপন জারি হলেও তা উপেক্ষা করছেন শিক্ষকরা। এতে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
এসএসসি পরীক্ষার আগে নির্বাচনি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েও পরীক্ষায় বসতে না পারায় ক্ষোভ জানায় দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা। সারা বছর ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে তা না হওয়ায় পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে বলেও অভিযোগ করে তারা।
রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী উসওসুয়া তুল হাসনা বলে, ‘শিক্ষকরা ধর্মঘটে যাবেন। এটি আমাদের কোনোভাবেই আগে জানানো হয়নি। সোমবারও এসে পরীক্ষা দিতে পারিনি ফিরে গেছি। রাতে দেখলাম সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে পরীক্ষা হবে। কিন্তু আজ মঙ্গলবার স্কুলে এসে দেখলাম শিক্ষকরা পরীক্ষা নিচ্ছেন না।’
শিক্ষকরা পরীক্ষার্থীদের মানসিক হয়রানিতে ফেলেছেন অভিযোগ করে এই শিক্ষার্থী বলে, ‘টেস্ট পরীক্ষা যদি দিতে না পারি সামনে আমার এসএসসি পরীক্ষা। তাহলে কিভাবে পরীক্ষার প্রিপারেশন সঠিক রাখবো। আজকে যে পরীক্ষা নেওয়া হবে না সেটিও আমাদেরকে জানানো হয়নি। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আমরা পরীক্ষা দিতে চাই। প্রশাসন সেটি কিভাবে করবেন, আমাদের দেখার বিষয় নয়।’
পরীক্ষা না হওয়ায় ক্ষুব্ধ রংপুর জিলা স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ তাসিনও। সে জানায়, মঙ্গলবার ধর্ম পরীক্ষা ছিল। প্রস্তুতিও বেশ ভালো ছিল। তবে পরীক্ষা দিতে এসে দেখে তা নেওয়া হচ্ছে না।
তাহসিনের ভাষায়, ‘আবার কবে পরীক্ষা হবে তাও জানতে পারিনি। আমরা এতে দুই ধরনের হয়রানির মুখে পড়েছি। একটা হচ্ছে আমাদের প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর একটা- এবার পরীক্ষা হবে নাকি হবে না, কিভাবে আমরা অন্য ক্লাসে উত্তীর্ণ হব তা উদ্বিগ্ন।’
একই ক্লাসের শিক্ষার্থী ইউসুফ আব্দুল্লাহ রিয়াদ বলে, ‘সারা বছর ধরে আমরা বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেই। আমাদের একটা নির্দিষ্ট টার্গেট থাকে। যখন পরীক্ষা শুরুর দিনেই আমরা হোঁচট খেলাম, বাকি দিনগুলোর কি অবস্থা হবে জানিনা। আমরা পরীক্ষা দিতে চাই। শিক্ষকদের দাবি কিভাবে সরকার মানবে সেটা তো আমার দেখার বিষয় না। আমার দাবি, আগামীকাল থেকেই যেন পরীক্ষা দিতে পারি।’
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ অভিভাবকরাও। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ফেলে শিক্ষকরা কোনোভাবেই ধর্মঘটে যেতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন অনেকে। আবার অনেকের মতে, শিক্ষকদের দাবি যৌক্তিক হলেও শিক্ষকরা পরীক্ষার সময় কর্মবিরতিতে যেতে পারেন না। তাদের উচিত ছিল পরীক্ষা শেষের অপেক্ষা করা অথবা আরও আগেই এ বিষয়ে সরকার ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করা।
রংপুর জেলা স্কুলের প্রধান ফটকে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাদের অভিভাবক সম্পা বেগম বলেন, ‘কোনোভাবেই শিক্ষকরা পরীক্ষা বন্ধ রাখতে পারেন না। তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ রেখেছে। পৃথিবীর কোনো সভ্য রাষ্ট্রে এটা হতে পারে না।’
এই অভিভাবক আরও অভিযোগ করেন, ‘আমরা এডিসির কাছে গিয়েছিলাম… তিনি বলেছেন পরীক্ষা তো হওয়ার কথা। যখন প্রধান শিক্ষকের কাছে আসলাম। তিনি বললেন সহকারী শিক্ষকরা পরীক্ষা নিচ্ছেন না। সরকারি নির্দেশ কিভাবে অমান্য করেন শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে এটা বোধগম্য নয়।’
রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইমাতুল অবন্তির মা আকলিমা আহমেদ ফেরদৌসী জানান, সোমবার পরীক্ষা হয়নি, মঙ্গলবার হচ্ছে না। বাকি পরীক্ষা হবে কি না সেটিও কাউকে জানানো হচ্ছে না।
ক্ষুব্ধ ভাষায় তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারের কোনো যোগাযোগ নেই। এটা মানা যায় না। পরীক্ষা না হলে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়বে। তাদের সব প্রস্তুতি, পরিশ্রম বিফলে যাবে।’
এদিকে, মঙ্গলবার সকাল ৯টায় পরীক্ষা না হওয়ায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) শরীফুল ইসলামের কাছে ভিড় জমান অভিভাবকরা।
তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা আছে পরীক্ষা চালু রাখার। রংপুরের নয়টি সরকারি স্কুলের মধ্যে জেলা স্কুল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা হচ্ছে না। বাকি ছয়টিতে পরীক্ষা হচ্ছে। আমরা সংশ্লিষ্ট তিন প্রধান শিক্ষককে ডেকে পরীক্ষা চালু রাখা যায় কিভাবে সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছি।’
প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পরেও পরীক্ষা না হওয়ার বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তারা দাবি না মানা পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরতে চান না। রংপুর জেলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘দাবি আদায় না হলে আমরা পরীক্ষা ক্লাসে ফিরব না।’


