সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশকে সতর্কবার্তা দিয়েছে যে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে সন্দেহভাজন ভারতবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকতে পারে। তাতে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলে এরই মধ্যে নতুন করে কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের ভেতরে অন্তত ডজনখানেক জায়গা চিহ্নিত করেছে ভারত, যেখানে উত্তর–পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্য বা সমর্থকরা সক্রিয় থাকতে পারে।
গত সপ্তাহে কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের শীর্ষ বৈঠকের আগে দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা–বিষয়ক উপদেষ্টাদের (এনএসএ) বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা–দিল্লির মধ্যে এই মূল্যায়ন বিষয়ে আলাপ হয়।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তার বাংলাদেশি সমকক্ষ খলিলুর রহমানের হাতে মানচিত্র ও তাদের চালচলনের বিশ্লেষণসহ গোয়েন্দা প্রতিবেদন তুলে দেন। চিহ্নিত সন্দেহভাজন জায়গাগুলো উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলা এবং ফেনী ও সিলেটের কিছু অংশে বিস্তৃত বলে জানা গেছে।
সীমান্তজুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উপস্থিতির অভিযোগ নতুন নয়। নব্বইয়ের দশক ও একুশ শতকের শুরুর দিকে ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের ঘাঁটি ছিল বাংলাদেশে। ২০০৯ সালের পর থেকে ধারাবাহিক অভিযানে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেয় ঢাকা।
তবে এবার ভারতের এই সতর্কবার্তা এসেছে এক বিশেষ সময়ে—যখন তাদের নিজেদের উত্তর–পূর্বাঞ্চলও অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মণিপুরে ২০২৩ সাল থেকে চলমান জাতিগত সংঘাত নিরাপত্তা–বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দিয়েছে এবং দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা নেটওয়ার্কগুলো পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে।
গত অক্টোবরেই ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের একজন কর্মকর্তা ঢাকা সফর করেন। তারা সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সামনে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার প্রাথমিক ইঙ্গিত’ তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থা, যেমন- ডিরেক্টর জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই), মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এরই মধ্যে সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। মাঠপর্যায়ে যাচাই–বাছাই, স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও ভারতীয় তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী ঘাঁটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকটি এলাকায় ‘অস্বাভাবিক কার্যক্রম’ টের পাওয়া গেছে, সেসব নজর রাখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতের সতর্কবার্তার সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ। কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর সিলিগুড়ি করিডর নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ বাড়ছে। এই করিডোরই ভারত–নিয়ন্ত্রিত উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে যুক্ত করে রাখে। মিয়ানমারের পরিস্থিতিও ভারতের হিসাব–নিকাশকে জটিল করেছে। দেশটিতে সীমান্তবর্তী এলাকায় লড়াই তীব্র হয়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও অস্থিতিশীল করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই সতর্কবার্তার মধ্যে শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণ বা পাল্টা–অভিযানের বিষয়টি আছে তাই নয়, বরং এর সঙ্গে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা–হিসেবে স্থিতি বজায় রাখার চাপও রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি, প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ—সব মিলিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চল নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মাঝে মাঝেই মাথাচাড়া দেয় রাজনৈতিক মতবিরোধ, তারপরও দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা বরাবর বেশ ভালো। সাম্প্রতিক তথ্য বিনিময় থেকে বোঝা যায়, সেই পুরোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, নতুন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নাজুক সীমান্ত বাস্তবতার মধ্যে ঢাকা–দিল্লির নিরাপত্তা সমন্বয় আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে।


