মুখে সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে সরকারকে কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেন, ‘এই সরকার সংস্কার নিয়ে অনেক কথা বলে। সংস্কার নিয়ে যত কথা আমরা গত এক বছরে শুনেছি তা গত ৫৪ বছরেও এত শুনি নাই। সংস্কারটা ঠিক কোন জায়গাটায় কীভাবে হবে সেটা আমরা এখন পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখিনি।’
শুক্রবার সকালে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আন্তঃসীমান্ত নদী বিষয়ক এক আলোচনা সভা ও মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘একমাত্র সংবিধান নিয়ে কিছু সংস্কারের সুনির্দিষ্ট আলোচনা দেখা যায়। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে সংস্কারের প্রকৃত উদ্যোগ নেই।’
সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আওয়াজটা শুনি যে দিল্লি না ঢাকা ইত্যাদি। কিন্তু ঢাকাকে শক্তিশালী করার জন্য যে উদ্যোগগুলি দরকার সুনির্দিষ্ট সেই উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’
দেশের নদীগুলোর করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নদী আমাদের অস্তিত্বের অংশ, অথচ নদী নিয়ে কোনো সংস্কার কমিশনই হয়নি। সরকারের জন্য সহজ কাজ ছিল নদী বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা এবং জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করা, কিন্তু কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।’
দেশের ভেতরে নদী দখল ও দূষণের ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য না থাকলেও নদী ধ্বংসের ক্ষেত্রে ব্যাপক জাতীয় ঐক্য দেখতে পাওয়া যায় অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যে কিছুদিন আগে পাথর উত্তোলনের ক্ষেত্রে দেখলাম এইরকম জাতীয় ঐক্য আপনারা অন্য কোথাও পাবেন না। আওয়ামী লীগ ছিল, সেখানে বিএনপি ছিল, জাতীয় পার্টি ছিল, এনসিপি ছিল, জামায়াতে ইসলামী ছিল, আমলারা ছিল, পুলিশ ছিল। সম্মিলিত একটা উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে তারা নদী বিধ্বংসী তৎপরতাগুলো চালাচ্ছিল।’
এসব রাজনৈতিক দল থেকে নদী রক্ষা বা দখলমুক্ত করার বিষয়ে কোনো কথা শোনা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনে দলগুলোর ইশতেহারে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অঙ্গীকার থাকবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সমুদ্রসীমা নিয়ে যে সাফল্য এসেছিল, তা আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নিয়েই সম্ভব হয়েছিল। তাই অভিন্ন নদীর সমস্যার সমাধানে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যথেষ্ট নয়।’
তিনি এর সহজ বিকল্প হিসেবে জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশনে সইয়ের আহ্বান জানান, যেটিতে ভারত এখনো সই করেনি।
নদী বিপর্যয়ের জন্য তিনি তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন। এগুলো হলো ভারতের একের পর এক বাঁধ নির্মাণ এবং আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা, বাংলাদেশের নিজস্ব বিভিন্ন বিধ্বংসী উন্নয়ন প্রকল্প, যেমন পোল্ডার, বাঁধ ও স্লুইস গেট, যা বিচার-বিবেচনা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে এবং দেশের ক্ষমতাবান রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর দখল ও দূষণ।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘নদী রক্ষা করতে হলে সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং আমলাদের বিভিন্ন প্রকল্প কীভাবে নদীগুলোকে শেষ করেছে, সেই প্রশ্নগুলো তোলা উচিত’।
জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি (সার্ভেল্যান্স) এর বিপরীতে পাল্টা নজরদারি (কাউন্টার সার্ভেল্যান্স) তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
জনগণের কণ্ঠস্বর, ঐক্যবদ্ধ সংহতি এবং প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যেন রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় ঐক্যের বিপরীতে জনগণের জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়। এতেই নদী রক্ষা পাবে এবং আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।’


