বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নিউইয়র্ক সফর নিয়ে উত্তেজনার পারদ চড়ছেই।
সবশেষ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রোববার রাতে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে হাতাহাতিতে জড়ান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রবাসী নেতাকর্মীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর থেকেই জ্যাকসন হাইটসে জড়ো হচ্ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। মুহাম্মদ ইউনূসকে স্বাগত জানাতে সেখানে তারা পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ করেন। যেখানে অংশ নেন দুই শতাধিক নেতাকর্মী।
রাত ৮টার দিকে সমাবেশ শেষ হতে না হতেই সেখানে উপস্থিত হতে শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা ইউনূস সরকারবিরোধী পাল্টা স্লোগান দেন। বিএনপির নেতারা তাদের সেখান থেকে সরে যেতে বললেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তা মানেননি। এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক পুলিশকে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল লতিফ সম্রাট বলেন, ‘মুহাম্মদ ইউনূস একজন বিশ্বমানের ব্যক্তি, তাকে স্বাগত জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে অপমান করার চেষ্টা করছে, যা আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হতে দিতে পারি না।’
তবে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জ্যাকসন হাইটসের ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করেন।
সফরসূচি অনুযায়ী সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকালের পর নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে নামবেন প্রধান উপদেষ্টা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক তাসনিম জারা।
এ ছাড়া নিউইয়র্ক থেকে প্রধান উপদেষ্টার বহরে যুক্ত হবেন যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের মুখপাত্র নকিবুর রহমান তারেক। যিনি জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে।
শুরু থেকেই এই সফরের বিরোধিতা করে আসছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। মুহাম্মদ ইউনূসকে ঠেকানে ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, মিশিগান, শিকাগো, বস্টন, পেনসিলভেনিয়া, ভার্জিনিয়া, ম্যারিল্যান্ড, নিউজার্সি, কানেকটিকাট থেকে নেতাকর্মীদের নিউইয়র্কে আসতে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
এরই মধ্যে শতাধিক নেতাকর্মীকে নিউইয়র্কে দেখা গেছে। তারা জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের সামনে জমায়েতের চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সেক্রেটারি সামাদ আজাদ, দক্ষিণাঞ্চলীয় শাখার সভাপতি এম ফজলুর রহমান, সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলী মানিক এবং নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ইমদাদ চৌধুরী এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্রে তা নয়। ফলে নানা ধরনের কর্মসূচি দিয়ে নেতাকর্মীদের চাঙা রাখছে দলটি। প্রকাশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করছে।
এ ছাড়া, মুহাম্মদ ইউনূস যে হোটেলে থাকবেন, তার সামনে প্রতিদিন অবস্থান কর্মসূচি ও কালো পতাকা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। আগামী শুক্রবার জাতিসংঘে ইউনূসের ভাষণের সময়েও কালো পতাকা প্রদর্শন এবং বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে দলটি।
টাইমস স্কয়ারের কাছে ম্যারিয়ট মারক্যুস হোটেলে ইউনূসের মতবিনিময় অনুষ্ঠানের বাইরে বিক্ষোভ করার জন্য নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের অনুমতিও নেওয়া হয়েছে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিউইয়র্কে অবস্থান করার নির্দেশনাও এসেছে দলের পক্ষ থেকে।
আওয়ামী লীগ যেখানে প্রধান উপদেষ্টাকে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে, তার বিপরীতে তাকে স্বাগত জানাতে কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত। দলদুটির নেতাকর্মীরাও বিমানবন্দরের সামনে অবস্থান নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের যেকোনো ‘ষড়যন্ত্রের’ জবাব দিতে নেতাকর্মীদের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
বিএনপির পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গোলাম ফারুক শাহীন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ গত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের ইমেজ ক্ষুণ্ন করেছে, গুম, খুন, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। ছাত্র-জনতা গত বছর জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী অপশক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে লড়বে।’
আওয়ামী লীগ-বিএনপির এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের বিপরীতে মুহাম্মদ ইউনূসের সফর ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে নিউইয়র্কে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট। নিউইয়র্ক পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠিও দেওয়া হয়েছে।


