রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেনে যুদ্ধের জেরে মস্কোর ওপর ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকর হওয়ার কয়েকদিন আগে সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিধান কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি রপ্তানিতে রাজি হওয়ায় দেশটির পণ্যের ওপর শুল্ক স্থগিত এবং তেল ও গ্যাস কেনার কারণে অন্য দেশগুলোর ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আপাতত বাতিল করেছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, গত মাসে নিজের সই করা একটি আইনের আওতায় এসব নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকর করার কথা ছিল ট্রাম্পের। তবে শুক্রবার হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত এক নির্বাহী আদেশে তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় এসব বিধান কার্যকর করা থেকে তিনি অব্যাহতি দিয়েছেন।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ওই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের অবস্থান আরও নমনীয় হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন। এমনকি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকর হলে তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে তীব্র লড়াই করছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় এরইমধ্যে সাধারণ মানুষের হাঁসফাঁসের কারণ হয়ে দাঁড়ানোয় তাদের নির্বাচনের আগে কিছুটা স্বস্তি সাইট চাইছেন ট্রাম্প। নতুন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার ফলে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারত বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশ্লেষকেরা।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম রাশিয়া ও ইরান নিষেধাজ্ঞা আইন, ২০২৬’-এ সই করেন ট্রাম্প। আইনটির প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম।
আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বা গ্যাসের পাঁচ বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আনা সব পণ্যের ওপর ৩০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিধান রাখা হয়েছিল।
পাশাপাশি আইনটি কার্যকর হওয়ার ৩০ দিন পরও কোনো দেশ জেনেশুনে রাশিয়ার তেল বা গ্যাস কিনলে সেই দেশের পণ্যের ওপরও শুল্ক আরোপের সুযোগ ছিল। রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সবচেয়ে বেশি সহায়তাকারী পাঁচটি দেশের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ছিল।
তবে শুক্রবারের নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি কিংবা তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরবর্তী পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত এই অব্যাহতি বহাল থাকবে। আদেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কংগ্রেসে একটি প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছি, যেখানে জানিয়েছি যে বর্তমান সময়ে এ ধরনের অব্যাহতি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল।’
রাশিয়ার তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা চীন ও ভারত এর আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইনটি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। চীনের দাবি, আন্তর্জাতিক আইনে ভিত্তি নেই এমন বিচারিক এখতিয়ার নিজ দেশের সীমানার বাইরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা বরাবরই বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে, নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছিল, নতুন শুল্ক আরোপ করা হলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইনটিতে প্রেসিডেন্টকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয় বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেসকে জানালেই প্রেসিডেন্ট তা থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন।
তবে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ডন বেয়ার। তার অভিযোগ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে নতি স্বীকার করেছেন ট্রাম্প।
এক বিবৃতিতে ডন বেয়ার বলেন, ‘পুতিনের কাছে ট্রাম্পের সবশেষ আত্মসমর্পণ আবারও আমাদের ইউক্রেনীয় অংশীদারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার বেআইনি আগ্রাসী যুদ্ধের জন্য দেশটিকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রণীত আইনের মাধ্যমে কংগ্রেস যে সুস্পষ্ট অভিপ্রায় প্রকাশ করেছিল, তারও বিরোধিতা করেছে।’
এর আগেও রাশিয়ার সঙ্গে সাম্প্রতিক একটি ডিজেল সরবরাহ চুক্তি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ট্রাম্প। কয়েকজন মার্কিন সিনেটর ওই চুক্তির সমালোচনা করেন, তাদের মধ্যে রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন সদস্যও ছিলেন।
ওই চুক্তির আওতায় জ্বালানির দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়ার রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হন ট্রাম্প। বিনিময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল সরবরাহ করতে রাজি হয় রাশিয়া।
আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, এর ফলে রাশিয়া অতিরিক্ত অর্থ আয় করার সুযোগ পাবে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে দেশটির যুদ্ধ পরিচালনায় অর্থায়ন করতে সহায়তা করবে।


