৫ টাকায় পূজার বাজার

৫ টাকায় পূজার বাজার
Advertisement
Advertisement

শরতের সোনাঝরা রোদ, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুলের দোলা জানান দিচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা। ঢাকের কাঠি আর শাঁখের ধ্বনিতে দেবী দুর্গার আবাহনে যখন দেশজুড়ে উৎসবের আবহ, ঠিক তখনই রাজধানীর শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক রমনা কালী মন্দির প্রাঙ্গণে উন্মোচিত হলো এক অনন্য সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগ।

উৎসবের আনন্দে ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান মুছে দিতে এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের আয়োজনে চালু হয়েছে বিশেষ ‘৫ টাকায় পূজার বাজার’।

সংকট ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী মহতী উদ্যোগটি সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আয়োজকদের মূল লক্ষ্য—সম্প্রীতির মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি করা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এ বাজার শুরু হয়ে চলে দিনভর।

পুরো প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু ও বিশৃঙ্খলাহীন রাখতে নেওয়া হয়েছে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা। দর্শনার্থী ও ক্রেতারা প্রথমে মন্দির প্রাঙ্গণে নির্ধারিত লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের প্রয়োজনীয় টোকেন সংগ্রহ করছেন। টোকেন সংগ্রহের পরই ক্রেতারা পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন স্টলে গিয়ে নির্দিষ্ট প্রতীকী মূল্যে পণ্য ক্রয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। এই সুশৃঙ্খল লাইনের ব্যবস্থা ও টোকেন পদ্ধতির কারণে দীর্ঘ ভিড়ের মাঝেও অত্যন্ত শান্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে কেনাকাটা সম্পন্ন হচ্ছে।

রমনা কালী মন্দিরের এই বিশেষ বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে স্টলগুলোর সুবিন্যস্ত আয়োজন ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস ব্যস্ততা। টোকেন দেখিয়ে অত্যন্ত সামান্য ও প্রতীকী মূল্যে পোশাক, শিক্ষা সামগ্রী ও খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করতে পারছেন ক্রেতারা। যেখানে ১ কেজি চাল, ১ কেজি লবণ ৫০ পয়সা, ১ কেজি মসুর ডাল, ১ ডজন ডিম, ১ প্যাকেট বিস্কুট, হ্যান্ডওয়াশ, টয়লেট ক্লিনার ১ টাকা, ১ লিটার সয়াবিন তেল, ২ কেজি আটা, ২ কেজি ময়দা, ১ কেজি চিনি, শিশুদের কাপড় ২ টাকা, ছোটদের শার্ট-প্যান্ট, স্কুল ব্যাগ ৩ টাকা, লুঙ্গি ৪ টাকা, শাড়ি, পাঞ্জাবি ৫ টাকা করে পাওয়া যাচ্ছে।

বর্তমান বাজারদর যেখানে সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে, সেখানে মাত্র ৫০ পয়সা থেকে শুরু করে ৫ টাকার মধ্যে এসব জরুরি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী হাতে পেয়ে সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে উঠেছে স্বস্তির হাসি।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, এটি কোনো দান কিংবা খয়রাতি সেবা নয়। বিনামূল্যে কোনো কিছু দিলে মানুষের মনে যে এক ধরনের সংকোচ বা হীনমন্যতা তৈরি হয়, তা দূর করতেই এই সামান্য প্রতীকী মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

আয়োজকরা আরও বলেন, ‘মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের মূল লক্ষ্য আর ধর্মীয় উৎসবগুলো সেই ভালোবাসা ও মানবিকতা ছড়িয়ে দেওয়ার সুন্দর উপলক্ষ। এবারে দূর্গাপূজায়ও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এ বছর সহস্রাধিক পরিবারের কাছে পূজার উপহার পৌছে দেওয়ার পাশাপাশি ৫০ হাজার মানুষের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হবে।’

আয়োজনের শুরু থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে জমে ওঠে সাধারণ মানুষের মিলনমেলা। সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে টোকেন ও নিত্যসামগ্রী সংগ্রহ করতে দেখা যায় সব বয়সের মানুষকে। এক দর্শনার্থী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘বাজারের যা দাম, তাতে পূজার দিনে ঘরে ভালো কিছু রান্না বা বাচ্চাদের নতুন কাপড় কিনে দেওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু এখান থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টোকেন নিয়ে এত কম টাকায় চাল, ডাল, তেল, ডিম আর পোশাক কিনতে পেরে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারছি।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের এই অনন্য উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন যাবৎ গরীব ও অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আজকে ১ টাকা দিয়ে ১ ডজন ডিম পাওয়া যাচ্ছে, ৫ টাকা দিয়ে একটা শাড়ি তারা দিচ্ছেন। অর্থাৎ এটা কাউকে ছোট করার জন্য নয়; একটা বিনিময়ের মাধ্যমে তারা আজকে সহায়তা করছেন।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘এভাবে যদি প্রতিটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের আর্থিকভাবে স্বয়ংস্পূর্ণ ব্যক্তিরা নিম্ন আয়ের, ছিন্নমূল ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান, তবে অবশ্যই আমরা সকলকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। আমি আরও খুশি হলাম যে সনাতন ধর্মের ভাই-বোনদের পাশাপাশি অন্য যেকোনো ছিন্নমূল ও গরীব মানুষও এখান থেকে সেই সুযোগটা পাচ্ছেন।’

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি যে আজকে আমরা লড়াই করে যাচ্ছি। আমাদের অর্থনৈতিক যে অবস্থা, এই অবস্থাটা অনেকদিন ধরে সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব যখন নিয়েছেন, একটা ভয়াবহ অর্থনীতির ওপর তিনি দায়িত্বটা নিয়েছেন। এটাকে গড়ে তুলতে অবশ্যই সময় লাগবে, সেই সময়টা সরকারকে দিতে হবে এবং এই সময়ের মধ্যে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।’

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘বর্তমান আর্থিক অবস্থার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আমরা আরও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। এই অবস্থা আমাদেরকে মোকাবেলা করতে হবে ধৈর্য, সহনশীলতার ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এবং শান্তিপূর্ণভাবে।’

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো ধর্ম-বর্ণের বিষয় নাই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন—“ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”। তাই অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। দেশ ভালো থাকলে আমরা সবাই ভালো থাকব। ১৭ বছর ধরে আমরা লড়াই করে একটা পর্যায়ে এসেছি, এই লড়াই যেন বিফলতায় ঢেকে না যায়। সেটার জন্য সবাইকে সংযমী ও ধৈর্যশীল হতে হবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad