কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, কৃষকের সমস্যা নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন।
তিনি বলেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরবরাহব্যবস্থার কোনো পর্যায়েই যাতে কৃষক প্রতারণার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু ভর্তুকি দিয়ে কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখা কতটা কার্যকর সমাধান, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা, উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা এবং কৃষি মূল্যসংযোজন শৃঙ্খলের অংশীদারেরা অংশ নেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, কৃষি খাত নিয়ে আলোচনায় কৃষকদেরই মূল বিবেচনায় রাখতে হবে। অথচ বাংলাদেশে এখনো কৃষি পেশাকে যথাযথ সম্মানের চোখে দেখা হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে এ পেশাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়। এমন একটি ধারণাও প্রচলিত রয়েছে যে, উন্নত হওয়া মানেই কৃষি ও কৃষিকাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা।
তিনি বলেন, কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলেও কৃষকের সমস্যাগুলো একই গুরুত্ব পায় না। অথচ কৃষি এমন একটি কৌশলগত খাত, যার ওপর মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নির্ভরশীল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যত উন্নতিই হোক না কেন, বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত খাদ্যের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করতেই হবে।
কৃষকের সমস্যা সমাধানে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজার ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে হবে। পচনশীল পণ্য সংরক্ষণে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোনো ব্যক্তি, মৌসুম বা সরবরাহব্যবস্থার কোনো পর্যায়ের অংশীজন যেন কৃষককে ঠকাতে না পারেন, সে জন্য কার্যকর কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ভর্তুকি দেওয়া হয়। তবে কৃষকের সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করে শুধু ভর্তুকি দিয়ে খাতটিকে টিকিয়ে রাখা আদৌ কার্যকর সমাধান কি না, তা নিয়ে ভাবতে হবে। জহির উদ্দিন স্বপন কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে কৃষকের কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ভ্যাল্যানটিন অ্যাচানচো বলেন, কৃষি প্রযুক্তির সাফল্য সম্মেলনকক্ষে নয়, কুড়িগ্রামের একজন নারী হাঁস-মুরগি পালনকারী, সিরাজগঞ্জের একজন দুগ্ধ খামারি কিংবা আশাগড়ের একজন তরুণ সংগ্রাহকের বাস্তব প্রয়োজন পূরণ করতে পারছে কি না, তার ভিত্তিতেই কৃষি প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ধারণ করা উচিত।
তিনি বলেন, শুধু প্রকল্পে বিনিয়োগ নয়; কৃষি সম্প্রসারণ, বিপণন, গ্রামীণ অর্থায়ন, কৃষক সংগঠন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি ব্যবসার সক্ষমতা বাড়াতেও বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে কৃষক ও বাজারের সংযোগ শক্তিশালী হবে এবং প্রকল্পের অর্থায়ন শেষ হলেও উদ্যোগগুলো টেকসই থাকবে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই সংস্থার কার্যক্রমে অগ্রাধিকার পাবে বাজারের সঙ্গে কৃষকের সংযোগ বৃদ্ধি, বিশেষ করে তরুণদের জন্য গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু, সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো।
ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান আলী এম খান উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন পর্যন্ত কৃষি খাতের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে অর্থায়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকি কমিয়ে কৃষি খাতে অর্থায়ন সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে দুটি পৃথক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়াল কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বীজ, পানি ও সার ব্যবহারের পরও প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের কৃষকেরা সম্ভাব্য ফলনের তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করতে পারছেন। উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ফসল নষ্ট হওয়ায় কৃষকের ক্ষতিও বাড়ছে।
তাবিথ আউয়াল আরও বলেন, আধুনিক কৃষি সরঞ্জামের উচ্চ প্রাথমিক ব্যয় এবং উচ্চ সুদের ঋণ কৃষকদের উন্নত উপকরণ ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করছে। উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ঘাটতি রয়েছে। কৃষির পাশাপাশি পশুপালন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং গবাদিপশুর নিরাপদ খাদ্য ও যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্যানেল আলোচনায় অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ভুট্টাসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য ও কাঁচামাল সরাসরি সংগ্রহের ক্ষেত্রে যোগাযোগ, পরিবহন এবং মাঠপর্যায়ে নির্ভুল তথ্যের অভাব বড় বাধা। ভুট্টার দাম প্রতিদিন ওঠানামা করে। মাঠপর্যায়ের সঠিক তথ্যের ঘাটতি ও দুর্বল পরিবহনব্যবস্থার কারণে উৎপাদন ও সংগ্রহের ব্যয় বেড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে। তাদের মতে, চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ এবং ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে কৃষক ও বাজারের মধ্যে সরাসরি সংযোগ বাড়ানো সম্ভব। এতে মধ্যবর্তী পর্যায়ের জটিলতা কমিয়ে কৃষিপণ্যের সংগ্রহ ও বিপণনব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি, ইনোভেটেকের স্বত্বাধিকারবিষয়ক প্রতিনিধি ক্রিস্টিনা ওলসেন এবং এগ্রোনোচেইন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমতিয়াজ ফারহান বিন হাবিব বক্তব্য দেন।


