পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের আফ্রিদি আবাদ এলাকায় একটি স্কুলের ছাদ ধসে ৩২ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষিকাসহ ৩৩ জন নিহত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ২০ শিশু।
লেডি রিডিং হাসপাতালের মুখপাত্র মুহাম্মদ আসিম ডনকে জানান, নিহত শিক্ষার্থীদের বয়স ৭ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। আহতদের অধিকাংশকে চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গুরুতর মাথায় আঘাত পাওয়া তিন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২-এর মুখপাত্র বিলাল আহমদ ফয়জি জানান, ওপরের তলার ছাদ নিচের ছাদের ওপর ধসে পড়লে শ্রেণিকক্ষটি ভেঙে যায়। এতে শিক্ষার্থীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে। পরে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে বলে জানান পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনার আফাক ওয়াজির।
পেশোয়ারের ক্যাপিটাল সিটি পুলিশের প্রধান মিয়ান সাঈদ আহমদ বলেন, দুর্বল কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত ভারের ছাদ নির্মাণ করায় ভবনটি ধসে পড়েছে। দুর্ঘটনার সময় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ছিল।
ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া অভিভাবক সামিউল্লাহ জানান, তিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে আট বছরের কম বয়সী তিন মেয়েকে উদ্ধার করেছেন। তাঁর ছয় সন্তান ওই স্কুলে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় তার ছেলে নিচতলার শ্রেণিকক্ষে ছিল। তবে পানি পান করতে বাইরে যাওয়ায় সে রক্ষা পায়।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০ থেকে ১৫ শিশুকে আটকে থাকতে দেখেন তিনি। পরে অন্যদের সঙ্গে মিলে তাদের উদ্ধার করেন।
স্কুল ভবনের নিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশ
দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করে খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছেন। একই সঙ্গে প্রদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন গভর্নর।
ঘটনার তদন্তে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ তিন সদস্যের একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ছাদ ধসের কারণ অনুসন্ধান, দায়ী বিষয়গুলো চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক জুলফিকার হামিদ উদ্ধার অভিযান তদারকির নির্দেশ দেন। অ্যাম্বুলেন্সের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশকে গ্রিন করিডর চালুর নির্দেশও দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর তদন্তের নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দুর্ঘটনার ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান, আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেন এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি প্রধানমন্ত্রীকে ফোনে দুর্ঘটনার বিষয়ে অবহিত করেন। এ সময় তিনি জানান, স্কুলের মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্কুলের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি, পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি এবং তার বোন আসিফা ভুট্টো-জারদারিও শোক প্রকাশ করেছেন। তারা নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। রাষ্ট্রপতি দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনে নিরাপত্তার মানদণ্ড নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফও এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে। পাকিস্তানে সংস্থাটির প্রতিনিধি পার্নিল আয়রনসাইড বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত শিশু, পরিবার ও সম্প্রদায়কে মানসিক-সামাজিক সহায়তা দিতে ইউনিসেফ প্রস্তুত। সরকারি ও বেসরকারি সব স্কুলের ভবনে নিরাপত্তার মানদণ্ড কার্যকর এবং নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
পাকিস্তানে ছাদ ধসের ধারাবাহিক দুর্ঘটনা
পাকিস্তানে দুর্বল নির্মাণকাঠামো ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর কারণে ভবন ও ছাদ ধসের ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
গত জুলাইয়ে উমরকোটের কাছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরের দেয়াল ধসে ৩ থেকে ১৩ বছর বয়সী তিন মেয়ে নিহত হয়। একই মাসে লাহোরের বাগবানপুরায় নির্মাণাধীন একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে এক শিশু নিহত ও পাঁচজন আহত হয়।
গত ৩০ জুন লাহোরের কাহনা এলাকায় একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশু নিহত হয়। এর দুই মাসেরও কম সময় আগে ডেরা গাজি খানে একটি বেসরকারি স্কুলের শ্রেণিকক্ষের ছাদ ধসে চার শিশু নিহত ও ২০ জন আহত হয়। তদন্তে জানা যায়, ভবনটির সম্প্রসারণকাজ চলার সময় ছাদটি ধসে পড়ে।
গত সপ্তাহে পাকপত্তনে ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় বাড়ির ছাদ ধসে দুই ব্যক্তি নিহত হন। জুনে গুজরাটের লালামুসায় নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ধসে এক শ্রমিক নিহত ও তিনজন আহত হন। একই মাসে লাহোরের নিশতার এলাকায় বাড়ির ছাদ ধসে দুজন আহত হন।
আগস্টে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টির পর ইসলামাবাদের শাহজাদ টাউনে বাড়ির ছাদ ধসে এক দম্পতি নিহত হন। আহত হন তাদের দুই মেয়ে।


