রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার আগে কেন সতর্ক করেনি সৌদি আরব?

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার আগে কেন সতর্ক করেনি সৌদি আরব?
সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার মুহূর্তে ধোঁয়া ও আগুন দেখা যায়। ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর নজরদারি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও থেকে স্থিরচিত্রটি নেওয়া হয়েছে। ছবি: সৌদি আরবের গণমাধ্যম মন্ত্রণালয়
Advertisement
Advertisement

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে হুথিদের ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এই হামলাগুলোর ঠিক কয়েক দিন আগে থেকে জনসাধারণকে আগাম হামলার বিষয়ে সতর্কতবার্তা দেওয়া বন্ধ রেখেছিল দেশটি। চার-চারটি হামলা চালানো হলেও কেন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত মুখ খোলেনি সৌদি সরকার।

ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরও বিশ্ববাসী ও নিজ দেশের মানুষের সামনে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ‘স্বাভাবিক ও শান্ত’ তুলে ধরার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে আসছে রিয়াদ। মূলত এই কারণে ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে বিমানবন্দরে এই রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনাটি সৌদি আরবের সার্বিক নিরাপত্তা এবং বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

বিমানবন্দরে হামলার আগে সতর্কবার্তা না দেওয়ায় সৌদি আরবে হামলার ঝুঁকি এবং দেশটির বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন ওই অঞ্চলে কর্মরত চারজন পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাদের মতে, সতর্কবার্তা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টাও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সৌদি শিক্ষাবিদ ও মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ আবাসিক ফেলো সুলতান আলামের বলেন, ‘সৌদি সরকার এখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে। তারা একদিকে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান চালাতে চায়, অন্যদিকে নিজেদের দেশের ভেতর ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবকিছু স্বাভাবিক আছে–এমন এক আশ্বস্ত পরিবেশ বজায় রাখতে চায়।’

সাধারণত সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ সংস্থা’ বা সিভিল ডিফেন্স এই আগাম সতর্কবার্তা পাঠায়। আগাম তথ্য না দেওয়ার কারণ জানতে সিভিল ডিফেন্স ও সরকারের তথ্য দপ্তরে ইমেইল পাঠিয়েছিল রয়টার্স। তবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, রিয়াদের এই দ্বিমুখী কৌশল হিতে বিপরীত হতে শুরু করেছে এবং নাগরিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।

অবশেষে তীব্র সমালোচনার মুখে সোমবার ফের সতর্কবার্তা জারি করেছে সিভিল ডিফেন্স। সেখানে রিয়াদ ও দক্ষিণ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহরে নতুন করে সম্ভাব্য হামলার হুমকির বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে। তবে বিমানবন্দরে হামলার কারণে তড়িঘড়ি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় প্রায় সব দেশ ধারাবাহিকভাবে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়ে আসছে। তবে নিজের দেশের সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে সৌদির স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে।

উদাহরণস্বরূপ, কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতিটি হামলার আগে নাগরিকদের মুঠোফোনে জরুরি বার্তা পাঠায়। গত জুলাইয়ের হামলার সময়ও বাসিন্দাদের ঘরের মধ্যে থাকতে এবং জানালার থেকে দূরে থাকার কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল দোহা। একই সঙ্গে বাহরাইন ও কুয়েতেও বারবার সাইরেন বাজিয়ে মানুষকে নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

সৌদি আরবও মে মাস থেকে জাতীয় জরুরি বার্তার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফোনে হামলার আগাম সংকেত দিতে শুরু করে। কিন্তু সম্প্রতি হুথিদের আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও পুরোপুরি নীরব হয়ে যায় এই সতর্ককরণ ব্যবস্থা। সিভিল ডিফেন্সের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের হামলার আগে তাদের শেষ বার্তাটি এসেছিল ২৯ সেপ্টেম্বর, যা মূলত দক্ষিণ অঞ্চলের নাজরান প্রদেশের জন্য ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সামরিক হামলার কোনো বার্তা না দিলেও প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রবল বৃষ্টি ও বন্যার ক্ষেত্রে সিভিল ডিফেন্স নিয়মিতই সতর্কবার্তা জারি করে আসছিল।

পাশাপাশি, গত মার্চ মাসে সরকারের জারি করা একটি কঠোর বিধিতে বলা হয়েছে–হামলা প্রতিহত করার কোনো দৃশ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের স্থান বা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না। এই নিয়ম ভাঙলে কঠোর বিচারের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে হামলার আগে সৌদি আরব কেন সতর্কবার্তা দেওয়া বন্ধ করেছিল, তা জানতে দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন মিত্র একটি পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তারা। বিষয়টি সরাসরি জানেন, এমন দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

ওই কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সতর্কবার্তাগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অতিরিক্ত বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। রাতে এসব বার্তার কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অনেক নাগরিক অভিযোগও করেছিলেন।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তারা কোনো জবাব দেয়নি।

সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, হামলার বিষয়ে জনসাধারণকে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে রিয়াদ। একই সঙ্গে দেশটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যাতে ব্যাহত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে চাইছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই পদ্ধতি হামলা নিয়ে মানুষের অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জনসাধারণকে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতি সম্ভবত তাদের বর্তমান সংকটেরই প্রতিফলন। হুতিদের হামলার জবাব দিতে হবে, কিন্তু এর ফলে সমাজে অস্থিরতা তৈরি হোক, সেটিও তারা চায় না। জনসাধারণকে দেওয়া বার্তায় এই দ্বিধা ফুটে উঠেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু হুতিদের আসন্ন হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা না দেওয়ায় মানুষের মধ্যে ঠিক সেই উদ্বেগই তৈরি হচ্ছে, যা তারা এড়াতে চাইছে।’

সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলি শিহাবি বলেন, ‘সৌদি আরব এক বিশাল আয়তনের দেশ। এখানে অসংখ্য বিমানবন্দর, তেলের স্থাপনা ও বিশাল পাইপলাইন ছড়িয়ে রয়েছে। চাইলেও একই সঙ্গে সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে নিখুঁত নজরদারিতে রাখা কঠিন। বর্তমানে যে আকাশ প্রতিরক্ষা বা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে, তা দিয়ে এই বিশাল এলাকা একযোগে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়।’

এদিকে বিমানবন্দর হামলার পর তীব্র নিরাপত্তা শঙ্কার মাঝেই সোমবার রিয়াদে বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। হামলায় আতঙ্কিত হয়ে বিশ্বসেরা কয়েকটি তেল কোম্পানির শীর্ষ প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠান থেকে শেষ মুহূর্তে নাম প্রত্যাহার করলেও সম্মেলনে সৌদি রাজপরিবার ও জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান তাদের অবস্থানে অনড় থাকেন। উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই দেশ নিরাপদ। তবে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে কোনোভাবেই পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই।’

সাধারণ মানুষ হামলার বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকলেও সৌদি আরবে অবস্থানরত পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাস কিন্তু ঠিকই আগেভাগে গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছিল। কূটনৈতিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, চলতি মাসে রিয়াদে হওয়া প্রায় এক ডজন হামলার প্রতিটি ক্ষেত্রেই দূতাবাসগুলো নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগাম বার্তা দিয়ে সতর্ক করেছে। এই তথ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং সৌদির উচ্চপর্যায়ের সূত্র থেকেই সরবরাহ করা হতো। তবে, শনিবারের হামলার আগে কেন কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স। গত সপ্তাহের হামলাগুলোর মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী।

হামলার পরের দিন রোববার সৌদির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শনিবারের সেই হামলার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, বিমান বন্দরের টার্মিনালে শত শত যাত্রী ফ্লাইটে ওঠার জন্য শান্তভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ কেউ লাউঞ্জের চেয়ারে বসে মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। আর ঠিক তখনই বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে একের পর এক ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র, মুহূর্তেই পুরো এলাকা ঢেকে যায় গাঢ় কমলা রঙের আগুনের গোলায়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad