পুলিশ কর্মকর্তার ছেলেকে হত্যা করে পুলিশেরই ৩ কর্তা: প্রসিকিউশন

পুলিশ কর্মকর্তার ছেলেকে হত্যা করে পুলিশেরই ৩ কর্তা: প্রসিকিউশন
Advertisement
Advertisement

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় পুলিশ বাহিনীরই তিন কর্মকর্তার সরাসরি অংশগ্রহণের দাবি করেছে প্রসিকিউশন।

২০২৪ সালের ২০ জুলাই কাজলা এলাকায় সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন এবং এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান জড়িত ছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোমবার ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও ফারুক আহাম্মদ এ দাবি করেন। ওই তিন কর্মকর্তার মধ্যে দুজনের ভিডিও এবং একজনের স্থিরচিত্র আদালতে প্রদর্শন করা হয়েছে।

ভিডিওতে গুলি চালানোর দৃশ্য রয়েছে বলেও দাবি করে প্রসিকিউশন। এ ছাড়া পালানোর চেষ্টা করা অপর এক আন্দোলনকারীকেও গুলি করা হয়েছিল বলে যুক্তিতর্কে উল্লেখ করা হয়। প্রথম দিনের যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৫ অক্টোবর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে তাইম হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন প্রসিকিউটররা। এ সময় আদালতে হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা ইকবালের কথোপকথনের ভিডিওর বিষয়বস্তুও তুলে ধরা হয়।

প্রসিকিউশন প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানায়, ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। এপিসি থেকে পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে তাইম ও তার বন্ধুরা যাত্রাবাড়ীর পূর্বদিকে কাজলা এলাকার একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নেন।

কিছুক্ষণ পর দোকানটির কাছে ২৫ থেকে ৩০ জন পুলিশ সদস্য জড়ো হন। তাদের দেখে তাইম ও তার বন্ধুরা দোকানের শাটার নামিয়ে দেন। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য বলেন, ‘এদের ক্রসফায়ার করে দিই।’

পুলিশ শাটার খুলতে বললেও তারা তা খোলেননি। পরে পুলিশ শাটার খুলে তাইমকে ধরে নিয়ে যায়। সাক্ষীর জবানবন্দির বরাতে প্রসিকিউশন জানায়, এ সময় এক পুলিশ সদস্য তাইমের বাম পায়ে ও কোমরের কাছে গুলি করেন।

আরও পড়ুন

প্রসিকিউশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ওই সময় পুলিশ দোকান থেকে বিভিন্ন মালামাল লুট করে। লুট করা পণ্যের মধ্যে ২৫ হাজার টাকার সিগারেটও ছিল।

তাইমকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তার বন্ধু ও মামলার সাক্ষী শাহরিয়ার। তবে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিতে দেয়নি বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। শাহরিয়ারকে উদ্দেশ করে পুলিশ সদস্যরা বলেছিলেন, ‘মরবি, নাকি যাবি? পিছনে তাকাবি না, দৌড় দে।’

তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ

যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশন জানায়, তাইম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন এবং এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান। তাদের মধ্যে দুজনের ভিডিও ও একজনের স্থিরচিত্র আদালতে প্রদর্শন করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, ভিডিওতে তাদের গুলি চালাতে দেখা যায়।

ঘটনার তিন প্রত্যক্ষদর্শী রাহাত, লিটন ও শাহরিয়ারের সাক্ষ্য তুলে ধরে প্রসিকিউশন জানায়, তাদের বর্ণনায় সামঞ্জস্য রয়েছে। সাক্ষীদের জবানবন্দির বরাতে প্রসিকিউশন আরও জানায়, ২০ জুলাই জাকির হোসেন ১৯৬ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিলেন এবং ওহিদুল হক মামুন পিস্তল থেকে দুই রাউন্ড গুলি করেছিলেন।

আদালতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের তৎকালীন কর্মকর্তা ডিসি ইকবাল হোসাইনের কথোপকথনের একটি ভিডিও চালানো হয়। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ভিডিওতে ‘একটা গুলি করি, মরে একটা, একটাই যায়, বাকিডি যায় না, স্যার’, এমন কথা শোনা যায়। এ ছাড়া তাইমকে গুলি করার ভিডিও এবং সাজ্জাদের স্থিরচিত্রও আদালতে প্রদর্শন করা হয়।

তাইমের বাবা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় খুব কাছ থেকে গুলি করে তার ছেলেকে হত্যা করে পুলিশ। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে তাইমের বন্ধু রাহাতকেও গুলি করা হয়।

গ্রেপ্তার দুই, পলাতক নয় আসামি

মামলার ১১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন দুজন। তারা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান এবং সাবেক এসআই শাহদাত আলী।

অন্য নয় আসামি পলাতক। তারা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক উপকমিশনার (ডিসি) ইকবাল হোসাইন, অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন এবং এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান। এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি এই ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad