গণশুনানি ছাড়াই প্রতি মাসে এলপিজি গ্যাসের দাম ঠিক করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংস্থাটির এই কাজ ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনের সঙ্গে কতটুকু মেলে—তা নিয়ে আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে।
আইনের ৩৪ ধারায় পরিষ্কার বলা আছে, জ্বালানির দাম নির্ধারণে কমিশনকে অবশ্যই সাধারণ গ্রাহকের স্বার্থ দেখতে হবে। বিধিমালা তৈরি করে লাইসেন্সধারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে প্রকাশ্যে গণশুনানি করার পরেই কেবল দাম চূড়ান্ত করার নিয়ম।
আইনে আরও বলা আছে, জ্বালানির দাম বা প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন না হলে এক অর্থবছরে একাধিকবার গ্যাসের দাম বদলানো যাবে না।
তবে বিইআরসির দাবি, প্রতি মাসে দাম সমন্বয়ের জন্য বারবার গণশুনানির দরকার নেই। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারের যে বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসের হিসাব হয়, সেগুলোর ওপর বিইআরসির কোনো হাত নেই।
সংস্থাটির আরও দাবি, ২০২১ সালের এপ্রিলে এলপিজির দাম নিয়ে যে একমাত্র গণশুনানি হয়েছিল, সেখানেই সব পক্ষ এই পদ্ধতিতে সায় দিয়েছিল।
তবে এ কথা মানতে নারাজ গ্রাহক অধিকার প্রতিনিধিরা। তাদের কথা—তারা কখনোই এমন সম্মতি দেননি। আর কোনো গণশুনানি কখনোই আইনের বাধ্যবাধকতা বাতিল করে দিতে পারে না।
এই বিতর্কের শুরু ২০২০ সালের আগস্টে। তখন হাইকোর্ট বিইআরসিকে গণশুনানির মাধ্যমে এলপিজির দাম ঠিক করার নির্দেশ দিয়েছিল।
আদালতের আদেশ অমান্য করায় ক্ষমাপ্রার্থনাসহ নানা নাটকীয়তার পর, তৎকালীন কমিশন ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথম ও শেষবারের মতো গণশুনানি করে। এরপর থেকে গত কয়েক বছর ধরে কোনো শুনানি ছাড়াই প্রতি মাসে এলপিজির নতুন দাম জানিয়ে আসছে বিইআরসি।
এ নিয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে এলপিজির দাম যেভাবে ঠিক করা হয়, তার জন্য নতুন করে গণশুনানির দরকার পড়ে না।
তিনি ব্যাখ্যা দেন, ‘২০২১ সালের অক্টোবরে যখন মূল্য কাঠামোর নিয়ম ঠিক করা হয়, তখন গণশুনানিতে সবার মতামত নেওয়া হয়েছিল। এখন যে দাম ঠিক হয়, তা মূলত দুই-তিনটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত ‘সৌদি সিপি’ বা আন্তর্জাতিক চুক্তিভিত্তিক দাম, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। দ্বিতীয়ত জাহাজ ভাড়া ও ডলারের দাম। আর তৃতীয়ত ডিজেলের মতো জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা। এই চার উপাদানের ওপর ভিত্তি করেই আমরা প্রতি মাসের দাম হিসাব করি। ফলে এসব নির্দিষ্ট হিসাবের জন্য বারবার গণশুনানির দরকার হয় না। কিন্তু আমরা যদি স্থায়ী খরচ বা অন্য কোনো উপাদানে হাত দিতাম, তবে অবশ্যই গণশুনানি করতে হতো।’
উৎপাদন খরচ তো নিয়মিত বদলায়, তাহলে বিদ্যুতের বেলায় কেন গণশুনানি হয়—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, বিদ্যুতের দাম এলপিজির মতো প্রতি মাসে বদলানো হয় না।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আমরা ৬ মাস বা ১ বছরের জন্য দাম ঠিক করি, প্রতি মাসে নয়। কিন্তু এলপিজির দাম আমাদের প্রতি মাসেই মেলাতে হয়। কমিশন জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলের দামও প্রতি মাসে মেলায়। দেশি কোনো কারণে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করেই এগুলো করা হয়।’
তবে বিইআরসির এই যুক্তি মানতে নারাজ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, দামের উপাদান বদলাচ্ছে—এই অজুহাতে আইন ভেঙে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘আদালত ও আইন স্পষ্ট করে বিইআরসিকে বলেছিল গণশুনানি করেই দাম ঠিক করতে হবে। আইনের ৩৪ ধারা অনুযায়ী বিইআরসির ক্ষমতার সীমা নির্দিষ্ট করা আছে। এখন তারা যেভাবে শুনানি ছাড়া দাম বাড়াচ্ছে-কমাচ্ছে, সেই আইনি এখতিয়ার তাদের একেবারেই নেই।’
গণশুনানি ছাড়া দাম নির্ধারণে গ্রাহক প্রতিনিধিদের সম্মতি দেওয়ার বিইআরসি চেয়ারম্যানের দাবিও উড়িয়ে দেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এই জ্বালানি উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘গণশুনানিতে এমন কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। ক্যাব তো সেই শুনানিতে অংশই নেয়নি। তা ছাড়া, আইন ভেঙে কোনো কাজ করার অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা গণশুনানির নিজেরই নেই। গণশুনানির যেকোনো সিদ্ধান্তকে আইনের ভেতরে থেকেই আসতে হবে।’
প্রতি মাসের হিসাব বদলানোর অজুহাত খারিজ করে শামসুল আলম বলেন, ‘হিসাবের উপাদান বদলাক আর যাই হোক, কোনো অজুহাতেই আইন অমান্য করা যায় না।’
২০২১ সালের এপ্রিলে নতুন নিয়ম চালু হওয়ার পর থেকে প্রতি মাসেই বেসরকারি এলপিজির দাম সামঞ্জস্য করে আসছে বিইআরসি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ২২১ টাকা। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৭৮ টাকা থেকে বেড়ে ডিসেম্বরে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯৭ টাকায়। ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৩২ টাকা থেকে বেড়ে হয় ১ হাজার ৪০৪ টাকা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ৪৩৩ টাকা, ডিসেম্বরে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৫৫ টাকায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা কমে ১ হাজার ৩০৬ টাকা হয়। ডিসেম্বরে আরও কমে দাঁড়ায় ১হাজার ২৫৩ টাকা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকাই রাখা হয়।
তবে ২০২৬ সালের অক্টোবরে এসে বিইআরসি হঠাৎ এক লাফেই ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা (প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ছয় পয়সা) নির্ধারণ করে, যা ৪ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বাড়ার কারণেই এই বড় লাফ বলে জানানো হয়। এর সাথে জাহাজ ভাড়া, ডলারের দর ও পরিবহনে ডিজেলের দামও যোগ করা হয়েছে।
কলকাতার চেয়ে বাংলাদেশে দাম অনেক বেশি
ভারতের সাথে বাংলাদেশের সরকারিভাবে নির্ধারিত এলপিজির দাম তুলনা করলে এই ফারাক স্পষ্ট বোঝা যায়।
ইন্ডিয়ান অয়েলের তথ্যমতে, কলকাতায় সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ১৪.২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ৯৬৮ রুপি। ১ অক্টোবর বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়লেও ঘরোয়া ব্যবহারের গ্যাসের দাম বাড়েনি।
দুই দেশের সিলিন্ডারের মাপে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও প্রতি কেজির হিসাবে ব্যবধানটা বিশাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী ১ রুপি সমান প্রায় ১ টাকা ২৭ পয়সা। সেই হিসাবে কলকাতায় সিলিন্ডারপ্রতি দাম পড়ে প্রায় ১ হাজার ২৩৩ টাকা, অর্থাৎ প্রতি কেজি প্রায় ৮৭ টাকা।
অথচ অক্টোবরে বাংলাদেশে নির্ধারিত দাম প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ছয় পয়সা। অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষ কেজিতে প্রায় ৬৬ টাকা বেশি দিচ্ছে। এই হিসাবে বাংলাদেশে ১৪.২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে খরচ হতো প্রায় ২ হাজার ১৭৩ টাকা। তবে এটি কেবল দুই দেশের নির্ধারিত বাজারদরের তুলনা; এর মধ্যে কর, সরকারি সাহায্য (ভর্তুকি) বা পরিবহন খরচের নিজস্ব পার্থক্যগুলো ধরা হয়নি।
তাছাড়া ভারতে ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’ (পিএমইউওয়াই) প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৬ সাল থেকে দরিদ্র পরিবারের নারীদের বিনামূল্যে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, তাদের জন্য বিশেষ সুবিধাও রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই প্রকল্পের গ্রাহকদের জন্য বছরে ৯টি সিলিন্ডার পর্যন্ত প্রতিটিতে (১৪.২ কেজি) ৩০০ রুপি করে সরাসরি সাহায্য বা ভর্তুকি দিচ্ছে ভারত সরকার। তবে সাধারণ সব গ্রাহক এই সুবিধা পান না।
ভারতে সাধারণ এলপিজির দামও আন্তর্জাতিক বাজার ও ডলারের ওপর নির্ভর করে। সরকার মাঝেমধ্যে দামের প্রভাব কিছুটা মেনে নিলেও, তেল কোম্পানিগুলোকে অর্থ সহায়তা দিয়ে এবং নির্দিষ্ট পরিবারকে ভর্তুকি দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর খরচের চাপ কম রাখে।
ভারত সরকারের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাধারণ এলপিজি আসল খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হচ্ছিল। ওই মাসে ১৪.২ কেজির প্রতি সিলিন্ডারে সরকার পরোক্ষভাবে ভর্তুকি দিয়েছিল প্রায় ২১০ রুপি।


