২০০৪ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত একটি পরিবেশগত গবেষণায় দেখা যায়, সিলেটের জাফলংয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পাথর উত্তোলন করায় ওই এলাকার জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
যদিও এর এক বছর পর, ২০০৫ সালে, জাফলংয়ের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে একটি পুনঃবনায়ন কর্মসূচি গ্রহণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে, স্থানীয় বিরোধ ও নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতায় সেই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয় বলে জানা যায়। এরপর দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বরং পর্যটনের ক্রমবর্ধমান বিস্তার এবং তা থেকে মুনাফা অর্জনে আগ্রহী স্থানীয় ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে জাফলংয়ের ওপর পরিবেশগত হুমকির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায়, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অবস্থিত জাফলংয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য বেশ নয়নাভিরাম।
মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া এসে মিশেছে পিয়াইন ও সারি-গোয়াইন নদীতে। এসব নদী ও জলধারা দীর্ঘদিন ধরে জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের আবাসস্থল। আশপাশের পাহাড়ে বসবাসকারী স্থানীয় খাসিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন ও জীবিকাও এসব নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
দেশি-বিদেশি পর্যটক ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় জাফলংয়ে নানা ধরনের পর্যটনসুবিধা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে দোকানপাট, নদীর তীরে বসার ব্যবস্থা এবং রয়েছে একটি নির্মাণাধীন পরিবেশবান্ধব শৌচাগার।

বাস্তবতা বলছে, এখানে নিয়মের প্রয়োগে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম সেন্টারপিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাফলংয়ের দোকানগুলোতে প্রকাশ্যেই ভারতের অবৈধভাবে আমদানি করা পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ এসব পণ্য কেনা পর্যটকদেরই পুলিশ থামিয়ে তল্লাশি করছে এবং পণ্য জব্দ করছে।
সরকারিভাবে ট্রেড লাইসেন্স স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, অবৈধ বাণিজ্য ও অনুমোদনহীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিরুদ্ধে বিধিবিধান প্রয়োগের দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসনের।

জাফলং-ডাউকি নদীর তীরের কিছু অংশকে আবার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিকাল এরিয়া বা ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, পাথর ভাঙার কল এবং ইসিএ-সংরক্ষণবিষয়ক নিয়ম না মানা দোকানসহ নির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর পরিবেশ অধিদপ্তরের এখতিয়ার রয়েছে। তবে দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের এই বিভাজন এমন কিছু ফাঁকফোকর তৈরি করতে পারে, যা দোকান মালিকেরা নিজেদের আর্থিক লাভের জন্য কাজে লাগাতে পারেন–যার মূল্য দিতে হয় পরিবেশকে।
নেই নিয়ন্ত্রণ, নেই ভারসাম্য
জাফলংয়ের তীরজুড়ে চোখ মেললেই নদীর পাড় এবং একসময় স্বচ্ছ-স্ফটিকের মতো পরিষ্কার পানিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনার স্তূপ চোখে পড়ে। একসময় যে স্বচ্ছ, স্ফটিকের মতো পানির জন্য জাফলং পরিচিত ছিল, সেই জলও আজ নানা ধরনের বর্জ্যে দূষিত হওয়ার চিহ্ন বহন করছে।
কাছে গেলে আবর্জনার স্তূপে নানা ধরনের ভারতীয় পণ্য চোখে পড়ে। যেগুলো সম্ভবত সীমান্ত পার করে অবৈধভাবে দেশে আনা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে নিত্যদিনের ব্যবহারের নানা বর্জ্য। যার মধ্যে আছে, শিশুদের ডায়াপার, পরিত্যক্ত জুতা, জুসের কাপসহ আরও কত কী।
অর্থাৎ শুধু অবাধ পর্যটন জাফলংয়ের পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এমন নয়। বরং পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের মতো সব বিষয়গুলো মিলেই পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। দোকানদার ও পর্যটক উভয়ের বেপরোয়া বর্জ্য ফেলার প্রবণতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারি জাফলংয়ের ভঙ্গুর পরিবেশগত ভারসাম্যকে আরও নাজুক করে তুলছে।

জাফলং শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়–এটি নদী, পাহাড়, বন, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকার এক আন্তঃনির্ভরশীল প্রতিবেশব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার কোনো একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা পরিবেশে।
তাই এখনই যদি পরিবেশের ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির উৎসগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে জাফলংয়ের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য হয়তো সেই আশঙ্কার চেয়েও অনেক দ্রুত হারিয়ে যাবে, যার পূর্বাভাস গবেষকেরা দুই দশকেরও বেশি আগে দিয়েছিলেন।
আর তখন হয়তো জাফলংয়ের স্বচ্ছ জল, সবুজ পাহাড় আর জীবন্ত নদীগুলো কেবল স্মৃতিতেই থেকে যাবে।


