বিশ্ব শিক্ষক দিবস/ দক্ষ শিক্ষক গড়ে তোলার পদ্ধতি নেই দেশে

দক্ষ শিক্ষক গড়ে তোলার পদ্ধতি নেই দেশে
Advertisement
Advertisement

মোহনা রহমান। আগামী বছর মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। নিয়মিত ক্লাস করলেও গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হয় তাকে। তার মা লাভলী আক্তার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ক্লাসে ওর রেজাল্ট ভালো। কিন্তু কিছু ক্লাসে শিক্ষকদের পড়া বোঝে না শিক্ষার্থীরা। এ কারণে ভালো ফলাফল ধরে রাখতে প্রাইভেট পড়াতে হয়।’

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার কাটাদুয়ার গ্রামের মোহনার মতো দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে এবং ইংরেজি বিষয়ে প্রাইভেট টিউশনির ওপর ভর করেই ভালো ফলাফল অর্জন করছেন।

অভিভাবকদের অভিযোগ, পাঠদানে শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি আছে। তারা নিজেরা পারেন কিন্তু শিক্ষার্থীদের বোধগম্য করে পড়াতে পারেন না। ফলে এলাকার অধিকাংশ স্কুলের ভালো শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে সেই গ্যাপটা কাটিয়ে নেয়।

ইউনেসকোর সর্বশেষ প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের শিক্ষকদের দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সংস্থাটির বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক শিক্ষকই ন্যূনতম দক্ষতার মান অর্জন করেননি। নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষকের হার ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ। সেই হিসেবে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে।

শিক্ষকদের দক্ষতা নির্ধারণে দুটি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। সেগুলো হলো সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে পাঠদানের জন্য কোনো শিক্ষকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ রয়েছে কি না এবং শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা সেই শ্রেণির জন্য উপযোগী কি না।

এসব বিবেচনায় মালদ্বীপে দক্ষ শিক্ষকের হার সর্বোচ্চ ৯৮ শতাংশ। এরপর যথাক্রমে দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ অবস্থানে আছে ভুটান, নেপাল, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। সবার শেষে বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে তবে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা অ্যাকাডেমি (নায়েম) এর মহাপরিচালক অধ্যাপক ওয়াসীম মো. মেজবাহুল হক টাইমসকে বলেন, ‘কোনো দেশের শিক্ষকদের কোয়ালিটি কেমন, সেটার ওপর নির্ভর করে সেই দেশের মান কেমন। শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষকদের স্কিল গুরুত্বপূর্ণ। স্কিলফুল শিক্ষক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের বড় অবদান থাকে। এ কারণে প্রশিক্ষণকে আরও বেশি কার্যকর করার প্রয়োজন আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পেছনে সরকার যে বিনিয়োগ করে, সেই হিসেবে আউটপুট কম। প্রশিক্ষণকে আরো বেশি ফলপ্রসূ করে তোলা উচিত-এখন সেই সময় এসে গেছে।’

এদিকে, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইজ)-এর ২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে, দেশের মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ১৭ শতাংশের ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে। গণিতের ক্ষেত্রে এই হার ১৫ শতাংশের কম, যা শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতিকে স্পষ্ট করে।

শিক্ষাবিদরা জানান, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। তবে প্রশিক্ষণগুলো কার্যকর হতে হবে।

আরও পড়ুন

ব্যানবেইসের জরিপে বিএড-এমএড ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে এসব প্রশিক্ষণের জন্য ১৪টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) এবং ৯০টি বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও শিক্ষকরা বিএড-এমএড কোর্স করতে পারেন।

শিক্ষাবিদদের অভিযোগ, শিক্ষকদের একটা বড় অংশ শুধু সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য এসব কোর্স করছেন। কিন্তু তাদের আধুনিক পাঠদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের মানোন্নয়ন ঠিকভাবে হচ্ছে না।

বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক জরিপ প্রতিবেদনের সঙ্গে শিক্ষাবিদদের অভিযএগর মিল পাওয়া গেছে। সেই প্রতিবেদনে, দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে অপর্যাপ্ত ও মানহীন শিক্ষক প্রশিক্ষণকে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, সরকারিভাবে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করলেও এসব প্রশিক্ষণে প্রধানত শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা এবং পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে শেখানো হয়।

বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট সম্পর্কে খুবই কম প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের বছরে মাত্র ছয় হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব, যা মোট শিক্ষকের সংখ্যার তুলনায় খুবই কম এবং এই সীমাবদ্ধতা দক্ষ শিক্ষক তৈরি করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ এবং ব্র‌্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ টাইমসকে বলেন, ‘শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষকের মানোন্নয়ন জরুরি। এসব নিয়ে সময় অন্তবর্তী সরকারের সময় আমরা শিক্ষাবিদরা বিস্তারিত সুপারিশ জমা দিয়েছি। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলে বাংলাদেশে আর আগের সরকারের কোনো সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হয় না, একারণে হয়তো বিষয়গুলো বিবেচনায় আসছে না। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নের সুপারিশের সঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের সম্পর্ক থাকা উচিত না। এটি শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর।’

অন্তবর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য গঠিত দুটি পরামর্শক কমিটির প্রধান ছিলেন অধ্যাপক মনজুর আহমদ। শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষকদের ভূমিকা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি এবং একই সঙ্গে শিক্ষকদের মর্যাদা শক্তিশালী করার জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশের স্কুল শিক্ষকদের বেতন স্তর দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন, যেখানে ভারতে গড় বেতন ৫০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৩০ শতাংশ বেশি। শিক্ষকদের পেশাগত সংগঠনগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যুক্ত থাকে এবং তারা মূলত বস্তুগত সুবিধা আদায়ের দর কষাকষিতেই ব্যস্ত থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষমতা সংক্রান্ত আলোচনায় তাদের অংশগ্রহণ খুবই কম। শিক্ষকের মান বৃদ্ধির জন্য এই পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।’

শিক্ষকদের অবস্থার পরিবর্তনের ব্যাপারে শিক্ষাবিদরা জানান, শিক্ষকদের বিষয়ে ৬০ বছর আগে ইউনেস্কো যেসব প্রস্তাবনা দিয়েছে, সেগুলো এখনো প্রসঙ্গিক। নতুন নতুন পরিকল্পনার পেছনে বারবার সময় নষ্ট না করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ইউনেস্কোর প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করাই এখন জরুরি।’

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি, গবেষণা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলিরেশন অ্যান্ড ট্রান্সফর্মেশন (হিট) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের অন্ত পাঁচ হাজার শিক্ষককে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং স্থায়ী ‘উচ্চশিক্ষা প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী টাইমসকে জানান, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

তবে সম্প্রতি  বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল (আইকিউএসি) এর একটি আলোচনা সভায় ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ-আল-মামুন জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন পেশাজীবীর জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য এ ধরনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। তাই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমি’ প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর জন্য ইতোমধ্যে সরকার অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে।

‘শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমিটি শুধু প্রচলিত শ্রেণিকক্ষভিত্তিক প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন আধুনিক ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রাখা হবে, যাতে তারা সমন্বিত পরিবেশে প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ পান,’ যোগ করেন তিনি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন।

টাইমসকে তিনি বলেছেন, ‘স্কুল শিক্ষকদের জন্য টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থাকতে পারে। সেখানকার শিক্ষকদের জন্য পেডাগজি বা শিক্ষণ-পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্ববিদ্যালয় তো উম্মুক্ত। এখানে কোনো টেক্সট বই থাকে না। কোনো পেডাগোজি থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করা প্রভৃতি কিছু কিছু বেসিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। তবে তাদের মূল প্রশিক্ষণটা গবেষণা কার্যক্রম এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারের অংশগ্রহণ-এসব থেকেই দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad