ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করছেন ঘর অথবা বহুতল ভবন তৈরির জন্য ছেড়ে যাচ্ছেন পুরোনো পারিবারিক বাড়ি। মনে হতেই পারে, বছরের পর বছর জমে থাকা পুরোনো কাগজপত্র, রসিদ, ম্যাগাজিন আর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বিমান টিকিটের স্তূপ রেখে আর কী হবে?
বিরক্তির সুরে হয়তো কপাল কুঁচকে বলেই ফেললেন, ধুর, ফেলে দেব, আর কী!
তাহলে বলবো, একটু দাঁড়ান। যেসব পুরোনো জিনিস ফেলে দিতে চাইছেন, তার মধ্যেও থাকতে পারে বেশ দামি কিছু।
সত্যিই!
এবার একটু ভালো করে দেখুন।
সত্তর বা আশির দশকে আপনার প্রয়াত বাবার ব্যবহার করা বিমান টিকিট। কিংবা স্বাধীনতার আগে আপনার দাদা বা নানার ব্যবহার করা কোনো টিকিট। হয়তো বিশ বছর আগে বেড়াতে যাওয়ার সময় আপনার নিজের ব্যবহার করা একটি টিকিট। আছে কি?
এগুলো মোটেই ফেলনা নয়। আবারও বলছি, মোটেই নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন বিমান সংস্থার টিকিট সংগ্রহে আগ্রহী সৈয়দ বিন সালাম তুহিনের মতে, যেকোনো বিমান টিকিটই সংগ্রহে রাখার মতো। কারণ, একটি টিকিটে নির্দিষ্ট সময়ের বিমান পরিবহন সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ছাপ থাকে।
গত সপ্তাহে এই চমৎকার মানুষটির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ডাকটিকিট, মুদ্রা আর অবশ্যই বিমান টিকিট—নানা ধরনের জিনিস সংগ্রহই তার নেশা।
তুহিন বললেন, প্রায় একুশ বছর আগে বিমান টিকিট সংগ্রহের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। তিনি যোগ করলেন, ‘এখন আমার সংগ্রহে প্রায় ৭০০ টিকিট আছে। এগুলো ৫৯টি বিমান সংস্থার।’
এই শখ এত আকর্ষণীয় কেন?
তুহিনের মতে, টিকিট শুধু কোথাও যাওয়ার ছাড়পত্র নয়, এটি একটি শিল্পকর্মও। কারণ, নকশা ও রঙের মাধ্যমে সম্ভাব্য যাত্রীকে আকৃষ্ট করে নিজেদের সেবা নিতে উৎসাহিত করাও একটি টিকিটের উদ্দেশ্য।
এই সংগ্রাহক বলেন, বাজারের অন্য যেকোনো পণ্যের মতো বিমান টিকিটেও একটি নির্দিষ্ট যুগের রুচির প্রকাশ ঘটে। অনেক সময় তাতে ধরা পড়ে সেই যুগের ভাবধারা।
কথাটি বোঝাতে তুহিন দেখালেন জাতীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশের সত্তর ও আশির দশকের কয়েকটি টিকিট।
যত্নে রাখা টিকিটগুলো বের করতে করতে তিনি বললেন, ‘রঙের সমন্বয়ে কত বৈচিত্র্য, দেখুন।’
এই সংগ্রাহক বললেন, বিমান টিকিট নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। কারণ, এখন আর কাগজের টিকিট দেওয়া হয় না, সবকিছুই হয় অনলাইনে।
‘এখন যারা বিমানে যাতায়াত করেন, তাদের অনেকেই জানেন না, আগে বাড়তি মালপত্রের জন্যও আলাদা টিকিট দেওয়া হতো।’
কথা বলতে বলতে তুহিন ভাই পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকের পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) একটি টিকিট বের করলেন।
প্রায় ৭৫ বছরের পুরোনো টিকিটটি কিছুটা নাজুক হয়ে পড়েছে। যাত্রীর নাম বিবর্ণ হয়ে গেলেও প্রতীকটি স্পষ্ট।
‘পিআইএর শুরুর দিকের টিকিটে ছুটন্ত বাঘের ছবি থাকত’, বললেন তুহিন ভাই। ‘পিআইএ’ লেখার ঠিক নিচে থাকা প্রাণীটির ছবির দিকে আঙুল দেখালেন তিনি।
তার সংগ্রহে পঞ্চাশের দশকের ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি টিকিটও আছে। আছে সত্তর ও আশির দশকের কয়েকটি টিকিট।
তুহিন জানালেন, বিমান সংস্থার কর্মীদের ভ্রমণের জন্য বিশেষ টিকিট লাগত। আমাকে পিআইএর একটি ‘এমপ্লয়ি ট্রিপ পাস’ দেখালেন তিনি।
এই সংগ্রাহক বললেন, অন্য পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতেও টিকিট ব্যবহার করা হতো। এরপর বিমানের একটি টিকিট উল্টে দেখালেন। পেছনে একটি নামকরা ছাতার বিজ্ঞাপন।
তুহিন ভাই বললেন, সত্তর ও আশির দশকে অনেক বাংলাদেশি কাজ করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তাদের অনেকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকিট রেখে দিয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকেই তিনি সৌদিয়া বিমান সংস্থার বেশ কিছু টিকিট পেয়েছেন।
নিজের প্রিয় টিকিটের কথা বলতে গিয়ে এই সংগ্রাহক বিমানের বিশেষ হজ টিকিটটি দেখালেন। এর নকশা ও সৌন্দর্য নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন তিনি।
‘এটি আরেকটি বিরল টিকিট’, ইউনিয়ন অব বার্মা এয়ারওয়েজের একটি টিকিট দেখিয়ে তুহিন বলেন। বিমান সংস্থাটি ১৯৪৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।
আমার সামনে প্রায় ষাটটি টিকিট রেখে তুহিন ভাই জানতে চাইলেন, ‘কোনটি আপনার সবচেয়ে ভালো লাগে?’ এক মুহূর্তও না ভেবে আমি বিমানের সাদা-নীল টিকিটটি দেখালাম, যেটিতে লাল রঙের লোগো রয়েছে।
আমি বললাম, ‘এটি দেখতে খুব পরিশীলিত ও রুচিশীল।’
তাই পরেরবার পুরোনো জিনিসের স্তূপ ফেলে দেওয়ার আগে ভালো করে দেখে নিন। আবর্জনার মধ্যেও হয়তো কোনো রত্ন লুকিয়ে আছে। আর বিমান টিকিট হলে রেখে দিন। আজ যা মূল্যহীন মনে হচ্ছে, কাল তা মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
খেয়াল রাখুন, অপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেলতে গিয়ে যেন মূল্যবান কিছু ফেলে না দেন!


