শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য নির্ধারিত চার একর আয়তনের মাঠ। অথচ সেখানে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি ট্রাক, বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি। মাঠের একাংশজুড়ে পড়ে আছে পরিত্যক্ত ফুডকোর্টের গাড়িও।
বাকি জায়গাটুকুতে খেলতে গেলেও বিপত্তির শেষ নেই। কোথাও ভাঙা দোলনা ও স্লাইড, কোথাও অসমান জমি, আবার কোথাও জমে আছে বৃষ্টির পানি। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনা আর ব্যবহারের অনুপযোগী গণশৌচাগার পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
রাজধানীর মিরপুর-১-এর গোলারটেক মাঠের চিত্র এটি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্যতম বড় এই খোলা জায়গাটি শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য নির্ধারিত হলেও বাস্তবে মাঠটির সেই উদ্দেশ্য ক্রমেই ব্যাহত হচ্ছে।
মাঠের বড় একটি অংশ দখল করে রেখেছে ৫০টির বেশি যানবাহন। এর বেশির ভাগই বিভিন্ন মামলার জব্দ করা গাড়ি, যেগুলো বছরের পর বছর ধরে সংরক্ষিত রয়েছে দারুস সালাম থানার অধীনে। অন্য একটি অংশে রাখা হয়েছে পরিত্যক্ত ফুডকোর্টের গাড়ি। ফলে মাঠের আয়তন চার একর হলেও শিশুদের খেলাধুলার জন্য ব্যবহারযোগ্য জায়গা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।

জব্দ করা যানবাহন রাখার সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। ২০০৮ সালে দারুস সালাম থানা প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই বছর পর থেকেই মাঠের একাংশে এসব যানবাহন রাখা শুরু হয়। এরপর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মাঠটি পুরোপুরি যানবাহনমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে জব্দ করা গাড়ির সংখ্যা কমবেশি হলেও সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
শুধু যানবাহনের দখলই নয়, মাঠের অবকাঠামোগত অবস্থাও নাজুক। শিশুদের জন্য স্থাপন করা কয়েকটি স্লাইড, দোলনা ও মাংকি বার ভেঙে গেছে। কোনো কোনো সরঞ্জাম এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে সেগুলো ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও শিশুরা সেগুলো ব্যবহার করছে।

মাঠের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে গর্ত ও অসমান মাটি। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমে কাদাপানির সৃষ্টি হয়। এতে মাঠের একাংশ ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিশুদের খেলাধুলার জন্য প্রয়োজনীয় সমতল ও নিরাপদ পরিবেশও সেখানে নেই।
স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাবও প্রকট। ডিএনসিসির নির্মিত একটি গণশৌচাগার মাঠের এক পাশে থাকলেও সেটি তালাবদ্ধ। ফলে শৌচাগারটি ব্যবহার করতে পারছেন না মাঠে আসা মানুষ। অন্যদিকে, মাঠের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে আবর্জনা। কোনো কোনো জায়গা খোলা শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

এভাবে যানবাহনের দখল, ভাঙা খেলাধুলার সরঞ্জাম, জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্নতা, সব মিলিয়ে গোলারটেক মাঠের স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে। যে মাঠে শিশু-কিশোরদের ছোটাছুটি করার কথা, সেখানে তাদের জন্য নিরাপদ জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
জব্দ করা যানবাহন সরানোর দাবি অবশ্য আগেও উঠেছে। ২০২২ সালে তৎকালীন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং স্থানীয় বাসিন্দারা মাঠ থেকে এসব যানবাহন সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। সে সময় পুলিশও যানবাহনগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
পুলিশের ভাষ্য, বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা যানবাহনগুলো সংরক্ষণ করতে হয়। মামলা ও আদালতের কার্যক্রমের জটিলতার কারণে অনেক গাড়ি বছরের পর বছর পড়ে রয়েছে। এসব যানবাহন রাখার বিকল্প জায়গা না থাকায় সেগুলো সরিয়ে নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।
দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘জব্দ করা যানবাহন সংরক্ষণ করা পুলিশের জন্য একটি জটিল সমস্যা।’
ওসি আরও জানান, বিকল্প জায়গা চেয়ে দারুস সালাম থানা থেকে ডিএনসিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন এখনো কোনো জায়গার ব্যবস্থা করেনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

গোলারটেক মাঠের সংকট তাই কেবল জব্দ করা যানবাহন সরানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। মাঠটিকে শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে তুলতে হলে যানবাহন সরানোর পাশাপাশি ভাঙা খেলাধুলার সরঞ্জাম মেরামত, মাঠের মাটি সমতল করা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং গণশৌচাগার চালু করাও জরুরি।
একটি মাঠের প্রয়োজন শুধু খালি জায়গা নয়, প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। গোলারটেকের শিশুরা সেই সুযোগ থেকে ধীরে ধীরে বঞ্চিত হচ্ছে।


