এক দিন আগে সংঘর্ষ, ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় মিরপুর-১০ এলাকা। তবে এক দিন পর সেই এলাকার চিত্র অনেকটাই শান্ত।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, মিরপুর-১০ গোলচত্বর, হোপ মার্কেট ও আশপাশের এলাকার ফুটপাতের বেশিরভাগ অংশ দখলমুক্ত। তবে বিভিন্ন স্থানে পড়ে আছে ভাঙা দোকানের বাঁশ, কাঠ ও অন্যান্য সরঞ্জাম। বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের দোকান পুড়ে যাওয়ার ক্ষত এখনো স্পষ্ট। সকাল থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মীরা উচ্ছেদ করা দোকানের ভাঙা মালামাল ও সরঞ্জাম সরিয়ে নিচ্ছেন।
মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে মিরপুর-২, মিরপুর-১৪ ও আশপাশের সড়কের দুই পাশের সড়কের পাশে আগের মতো হকারদের দীর্ঘ সারি নেই। ফুটপাতে হকারদের ঝোলানো তার, লাইটের ফোল্ডার ও ভাঙা চৌকি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ফুটপাতের বিভিন্ন স্থানে থাকা অস্থায়ী দোকান ও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও উচ্ছেদের পর পড়ে থাকা মালামাল ও ধ্বংসাবশেষ সিটি করপোরেশনের ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার মিরপুর-১০ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপস্থিতি কমে আসে।
তবে উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কিছু ব্যবসায়ী আবার ফুটপাতে ফিরতে শুরু করেছেন। ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ঢাকা ওয়াসা) নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সামনের ফুটপাতে বৃহস্পতিবারও কয়েকটি নার্সারির দোকান দেখা গেছে। এর পাশেই ছিল গতকালের উচ্ছেদের চিহ্ন। সেখানে দোকান বসানো কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বুধবার তাদের দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু জীবিকার তাগিদে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আবার দোকান খুলে বসেছেন তারা। তাদের দাবি, স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করে দিলে তারা ফুটপাতে বসবেন না।

হোপ মার্কেট এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত এখনো স্পষ্ট। বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদসংলগ্ন মসজিদ মার্কেটের কয়েকটি দোকান পুড়ে যাওয়ার পর সেখানে পোড়া মালামাল পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
জিসান ফ্যাশনের মালিক ইয়াসিন আরাফাত বলেন, আগুনে তাদের কয়েক লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার পর তাদের সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হওয়ায় মালামাল সরাতে তারা দোকানের ভেতরেও ঢুকতে পারেননি।

এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, তারা ফুটপাত অবৈধ দখলে দেখতে চান না। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেওয়ায় তারা স্বস্তি পেয়েছেন। ফুটপাতের কিছু অংশ দখলমুক্ত হওয়ায় পথচারীদেরও স্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
সরেজমিনে ফুটপাত দখলের পেছনে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয় কয়েকজন দোকানি জানান, মিরপুর-১০ নম্বর হোপের গলি ও পার্শ্ববর্তী ফুটপাতে কয়েক’শ দোকান ছিল। তাদের দাবি, প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন চাঁদা ও বৈদ্যুতিক বাতির খরচের নামে ৪৫০ টাকা নেওয়া হতো। তাদের ভাষ্য, হোপের গলি ও পার্শ্ববর্তী ফুটপাতে প্রায় ৭০০ থেকে ৭৫০টি দোকান ছিল।
মিরপুর-১০ নম্বর আইডিয়াল স্কুল ও সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাতেও ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ দোকান। স্থানীয় দোকানিদের দাবি, এসব দোকান থেকেও প্রতিদিন চাঁদা ও বৈদ্যুতিক বাতির নামে ২৫০ টাকা নেওয়া হতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দোকানি অভিযোগ করেন, জামাল, হাসনাত, সুলতান, শাহাদাত ও আবু নামের কয়েকজন এসব টাকা তুলতেন। তাদের মধ্যে শাহাদাত ও আবু নিজেদের বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচয় দেন।
অন্যদিকে, গতকালের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর মডেল থানায় তিনটি এবং কাফরুল থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোতে প্রায় দুই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান জানান, তিন মামলার একটি সিটি করপোরেশনের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায়, একটি পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে এবং অন্যটি ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন করে আসামি করা হয়েছে।

কাফরুল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। এতে ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগমের নেতৃত্বে এ অভিযান চলছিল।
অভিযানের একপর্যায়ে হোপ মার্কেটসংলগ্ন বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের নিচে থাকা ভাসমান দোকান সরাতে গিয়ে ভেকুর আঘাতে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন ধরে যায়। আগুনে মার্কেটের বেশ কয়েকটি দোকান পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আগুন লাগার পর ক্ষুব্ধ হকার ও দোকানিরা সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর হামলা চালালে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের সঙ্গেও হকারদের সংঘর্ষ বাধে। হকাররা ইটপাটকেল ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হন।
সংঘর্ষের সময় সিটি করপোরেশনের তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের একটি গাড়ির কাচও ভাঙচুর করা হয়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪ নম্বরের সড়কে কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরাও বাধার মুখে পড়েন।
পরে দুপুরের দিকে আবারও উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। মিরপুর-১০ থেকে ১৩ নম্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে থাকা ভাসমান দোকানগুলো উচ্ছেদ করা হয়।
দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলে আসেন ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও সিটি করপোরেশনের গাড়িগুলো পরিদর্শন করেন। পরে তিনি বলেন, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিকল্পিত। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে এবং তদন্ত করে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।


