দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে অনিয়মিত মৌসুমি ঝড়ের দাপটে গত এক সপ্তাহে নেপাল, ভারত ও থাইল্যান্ডে নতুন করে বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখা দিয়েছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এসব অঞ্চলের ভঙ্গুরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তর প্রদেশে ৬৬ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সেই হিসেবে এই অঞ্চলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৭৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে অন্তত ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উজানে নেপালে অতিবৃষ্টি ও ভূমিধসের কারণে পার্বত্য জেলাগুলোতে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। সেই দুর্যোগের ঢেউ আছড়ে পড়েছে আরও পূর্বে অবস্থিত থাইল্যান্ডেও। একটি সক্রিয় নিম্নচাপের প্রভাবে দেশটির মধ্য ও পূর্বাঞ্চলজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিস্তীর্ণ জলাবদ্ধতা ও বন্যা।

পরিস্থিতির অবনতিতে ব্যাংককের ৫০টি জেলাকেই দুর্যোগপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। মাত্র তিন দিনে রাজধানীতে ঝরেছে ৩২ সেন্টিমিটার বৃষ্টি। যা প্রায় এক মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সমান। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। এতে নগর কর্তৃপক্ষ পরিচালিত ৪০০টিরও বেশি স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিশেষ সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।
থাইল্যান্ডের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ২৯টি প্রদেশ ও রাজধানী ব্যাংককে বন্যায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৬ লাখেরও বেশি মানুষ। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ১২ দশমিক ৩ বিলিয়ন। যা প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।

তবে, বন্যার ক্ষতচিহ্ন শুধু পানিতে ডুবে থাকা জনপদেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। হাজার হাজার পরিবার জীবিকা হারানোর পাশাপাশি জরুরি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সংকটে পড়েছে।
পার্বত্য এলাকাগুলোতে ভূমিধস পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। বিশেষ করে অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢালের পাশে গড়ে ওঠা সড়ক ও জনবসতিগুলোতে বেড়েছে ঝুঁকি। প্রবল বর্ষণে মাটি সরে যাওয়ার পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে যোগাযোগব্যবস্থা, বাড়ছে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা।

হিমালয়ের পাহাড়ি ঢাল থেকে চাও ফ্রায়া অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এই ধারাবাহিক দুর্যোগ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জলবায়ু ঝুঁকির একটি বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরছে। ক্রমেই ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে ওঠা চরম আবহাওয়ার মুখে আন্তঃসীমান্ত বন্যা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো এবং টেকসই নগর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্পষ্ট।
একই নদীপ্রবাহ ভাগ করে নেওয়া এবং পরিবর্তিত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের অভিন্ন প্রভাব মোকাবিলা করা দেশগুলোর জন্য সাম্প্রতিক এই বন্যা আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। দুর্যোগ কোনো জাতীয় সীমান্তের তোয়াক্কা করে না। একটি দেশের পাহাড়ে নেমে আসা অতিবৃষ্টি কিংবা উজানের নদীর পানি মুহূর্তেই ভাটির অন্য দেশের জনপদে সংকট তৈরি করতে পারে।

এই বাস্তবতায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং বন্যা মোকাবিলায় টেকসই ও শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণ ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে চরম আবহাওয়া যখন আরও ঘন ঘন ও আরও তীব্র হয়ে উঠছে, তখন মানুষের জীবন, জীবিকা ও জনপদ রক্ষায় প্রস্তুতির বিকল্প ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।


