সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিক নিষিদ্ধ: তথ্যের অধিকার খর্ব

সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিক নিষিদ্ধ: তথ্যের অধিকার খর্ব
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গত ২ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের জামিন পান আসামি হাফিজুর রহমান। কিন্তু এই জামিনের খবর রাষ্ট্রপক্ষের অনেক আইনজীবী যেমন জানতেন না, তেমনি সাংবাদিকরাও সময়মতো সেই খবর পাননি।

গত ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় হাফিজুর জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে গেলে ৬ আগস্ট তার জামিন স্থগিত করা হয় এবং তাকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়।

আদালতের খবর যারা সংগ্রহ করেন, সেই সাংবাদিকদের জন্য এই ঘটনা বড় এক চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, এজলাসে বসে সরাসরি বিচারকাজ দেখতে না পাওয়ার ফল কতটা খারাপ হতে পারে, এটি তারই প্রমাণ।

সাংবাদিকদের মতে, এজলাসে ঢোকার ওপর কড়াকড়ি থাকায় এখন তাদের খবর পেতে দেরি হচ্ছে। ফলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ শুনানি ও আদেশের খবর আর আগের মতো সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এতে আদালতের উন্মুক্ত বিচারব্যবস্থা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ল’ রিপোটার্স ফোরাম (এলআরএফ) জানায়, গত ৭ জানুয়ারি থেকে আপিল বিভাগসহ সুপ্রিম কোর্টের কয়েকটি বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে কোনো আসামির জামিনের মতো সংবেদনশীল তথ্য তারা সময়মতো জানতে পারছেন না। দেখা যাচ্ছে, আসামি আদালত বা জেলখানা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর খবরটি সামনে আসছে।

এলআরএফ-এর সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্না টাইমসকে বলেন, তনু হত্যা মামলার আসামির জামিনের খবর দেরিতে পাওয়ার পেছনে সাংবাদিকদের এজলাসে ঢুকতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তই দায়ী।

তিনি বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় জামিনের খবর এলে রাষ্ট্রপক্ষ তা দেখে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু খবরই যদি সময়মতো না ছাপা হয়, তবে রাষ্ট্রপক্ষও বিষয়টি সময়মতো জানতে পারে না।’

সাংবাদিকরা জানান, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বিগত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টিংয়ের চর্চা ভেঙে পড়েছে।

তারা জানান, গত ৭ জানুয়ারি আপিল বিভাগে খবর সংগ্রহ করতে গেলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা তাদের ভেতরে ঢুকতে দেননি। সেই থেকে তারা আর বিচারকক্ষে বসে সরাসরি শুনানির খবর সংগ্রহ করতে পারছেন না।

আইন আদালতের সাংবাদিকদের মতে, সংবিধানের কঠিন বিষয়, আদালতের গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য ও আদেশগুলোকে তারা সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়। তাই সংবাদের ধারাবাহিকতা ও নির্ভুলতা ধরে রাখতে বিচারকক্ষে বসে সরাসরি খবর সংগ্রহের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা।

আরও পড়ুন

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের সঙ্গে কয়েকবার কথা বলেও গত আট মাসে এই সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী টাইমসকে জানান, সাংবাদিকদের এই উদ্বেগের কথা প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়েছে।তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হলে আমরা আপনাদের জানিয়ে দেব।’

এদিকে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে বারবার আবেদন করেছে এলআরএফ।

গত ২৯ জানুয়ারি রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি সর্বোচ্চ আদালতে শুনানির সময় সাংবাদিকদের অবাধ প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তারা উল্লেখ করেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সংবিধান, জনস্বার্থ ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার হয়।

উন্মুক্ত আদালত ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে সংগঠনটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারা, সংবিধানের ৩৫ ও ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের নিয়মাবলীর কথা তুলে ধরে।

ফোরাম আরও মনে করিয়ে দেয়, সংবিধান সংশোধনের মামলা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলা এবং ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো বড় বড় মামলার খবর সাংবাদিকরা এজলাসে বসেই সংগ্রহ করেছিলেন।

এরপর ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকের সামনে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন করেন সাংবাদিকরা। তারা অবিলম্বে বিচারকক্ষে ঢোকার অধিকার এবং খবর সংগ্রহের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।

সাংবাদিকদের মতে: বিচারকাজ দেখতে না দেওয়া কেবল পেশাগত বাধাই নয়, বরং জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া।

তারা জানান, বহু বছর ধরে সাংবাদিকরা এজলাসে বসেই খবর সংগ্রহ করতেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের ঢোকার ওপর মৌখিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের এই দাবিকে সমর্থন করেন।

টাইমসকে তিনি বলেন, বিচারকাজ সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়াই নিয়ম। প্রয়োজনে রেজিস্ট্রেশন, বিশেষ পাস বা অনুমতির ব্যবস্থা করে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন বা আমি নিজে কখনোই সাংবাদিকদের বিচারকক্ষে ঢুকতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি না।’

তার মতে, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাংবাদিক ও বিচারপ্রার্থীদের আদালতকক্ষে ঢোকার সুযোগ থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘এজলাসের ভেতরে কী ঘটছে, তা বিচারপ্রার্থী মানুষ এবং পুরো দেশের মানুষের জানার অধিকার রয়েছে।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব টাইমসকে বলেন, গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। আর বিচার বিভাগের আলাদা কোনো মুখপাত্র নেই।

তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে সাংবাদিকদের ঢুকতে না দিলে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়, যা বিচার বিভাগের জন্য মোটেও ভালো নয়।’

তিনি আরও বলেন, কেউ ভুল সংবাদ লিখলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এজলাসে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া কখনোই সঠিক সমাধান হতে পারে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad