চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দুই লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুই কর্মচারী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দিতে দলিল নিবন্ধনের সময় ঘুষ নেওয়ার পদ্ধতি এবং সাব-রেজিস্ট্রারের নির্দেশের কথা উঠে এসেছে। এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে এই ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুদক বলছে, ঘুষ লেনদেনের পুরো চক্র শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। ফলে পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে শুধু এই একটি দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেই ঘুষ নেওয়া হয়েছিল, নাকি দীর্ঘদিন ধরে একই পদ্ধতিতে অর্থ আদায় করা হয়েছে- তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার আবদুস সোবহান, হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপণ দাশকে দুই লাখ টাকা ঘুষসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে দুদক। এক আইনজীবীর অভিযোগের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়।
দুদক সূত্র জানায়, ওই আইনজীবী তার মক্কেলের দুটি অংশীদারি চুক্তিপত্র নিবন্ধনের জন্য কার্যালয়ে যান। দলিল দুটিতে কোনো ত্রুটি না থাকলেও নিবন্ধন আটকে রাখা হয়। পরে তাকে দুই লাখ টাকা ঘুষ দিতে বলা হয়। বিষয়টি জানিয়ে তিনি দুদকের হটলাইন ১০৬ নম্বরে অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পর নির্ধারিত ঘুষের টাকা নিয়ে ওই আইনজীবী কার্যালয়ে গেলে দুদকের দল সেখানে অভিযান চালায়। এ সময় দুই লাখ টাকা ঘুষসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
বুধবার তিনজনকে আদালতে হাজির করা হলে হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপণ দাশ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ফারুক ইসলাম বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার আবদুস সোবহানের নির্দেশে তিনি দুই লাখ টাকা ঘুষ নেন। ওই টাকা উমেদার রূপণ দাশের মাধ্যমে তার কাছে পাঠানো হচ্ছিল।
রূপণ দাশ তার জবানবন্দিতে জানান, তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে ওই কার্যালয়ে কর্মরত। যে দলিল নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটির সরকারি ফি ছিল ১৫ হাজার টাকা। তবে দলিল নিবন্ধনের জন্য অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়।
তার জবানবন্দি অনুযায়ী, প্রথমে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে আরও ২০ হাজার টাকা কমিশন দেওয়ার কথা ছিল।
দলিলদাতাদের একজন উপস্থিত হতে না পারায় তার বাসায় গিয়ে ওই টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। অথচ দলিলে কোনো ত্রুটি ছিল না।
দুদকের পিপি অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রনি বলেন, তিনজনের মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রার ছাড়া বাকি দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা সাব-রেজিস্ট্রারের নির্দেশে দলিল নিবন্ধনের সময় ঘুষ নেওয়ার কথা বলেছেন।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া দুদক চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. আল আমিন বলেন, ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার দুজন আদালতে ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘুষ লেনদেনের পুরো চক্র শনাক্তে দুদকের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনায় ঘুষের টাকা কার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছিল, কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং এর বাইরে আর কেউ নিয়মিতভাবে এমন লেনদেনে যুক্ত ছিলেন কি না- এসব বিষয় এখন খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে ওই কার্যালয়ে আগেও এ ধরনের অভিযোগ বা লেনদেন হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার রেজাউল করিম বকসু বলেন, ঘুষ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের ঘটনা হওয়ার কথা নয়।
আদালত জবানবন্দি গ্রহণ শেষে সাব-রেজিস্ট্রার আবদুস সোবহান, হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপণ দাশকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।


