হঠাৎ কেন এই জিন্নাহ বন্দনা?

হঠাৎ কেন এই জিন্নাহ বন্দনা?
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া জিন্নাহর ভাষণ। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হঠাৎ করেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন। তাকে কেউ কেউ ‘আধুনিক রাষ্ট্রের নির্মাতা’, ‘বিরল ব্যক্তিত্ব’ এবং এমনকি ‘জাতির প্রথম পিতা’ হিসেবেও অভিহিত করছেন।

২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রবণতা শুরু হলেও, জিন্নাহর সাম্প্রতিক প্রয়াণ দিবসকে কেন্দ্র করে এটি আরও তীব্র হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ইসলামী ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে নির্বাচিত সদস্যরা এর সবচেয়ে উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এবং বেশ কয়েকজন ব্যক্তিও এতে যোগ দিয়েছেন।

সংস্কারকৃত ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শিত হওয়ার পর এই বিতর্ক আরও গভীর হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেন, ছাত্রসংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানায় এবং ডাকসু এর জবাব দেয়।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন: জিন্নাহকে কি স্রেফ একজন ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, নাকি এই নতুন গুরুত্বের পেছনে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বয়ানকে নতুন রূপ দেওয়ার এক বৃহত্তর প্রচেষ্টা রয়েছে?

জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থকদের বিভিন্ন বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধকে একটি ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনও যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, পাকিস্তান ‘ভেঙে যাওয়ার’ কারণে মানুষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। জাতীয় সংগীত সম্পর্কিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা এবং স্বাধীনতাবিরোধী নেতাদের পক্ষে ঢাকায় স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা এসব ঘটনাবলীকে বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক মূল্যায়ন হিসেবে দেখার খুব একটা কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, ‘এটি ২৪-এর আগস্ট-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে যতটা সম্ভব ছোট করার একটি প্রচেষ্টা।’

১১ সেপ্টেম্বর ইনকিলাব মঞ্চ জিন্নাহকে ‘উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম রূপকার এবং পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল’ হিসেবে স্মরণ করে একটি ফটোপোস্টার প্রকাশ করে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামাতা ফাহাম আব্দুস সালামও জিন্নাহকে নিয়ে লিখেছেন।

তিনি লেখেন, ‘তিনি বিংশ শতাব্দীর একজন বিরল ব্যক্তিত্ব (সম্ভবত একমাত্র), যিনি একটি রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন। অন্য কেউ এই দাবি করতে পারবে না যে—আমি এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করেছি যার অস্তিত্বের কোনো কারণ ছিল না, যার নামটি পর্যন্ত ছিল একটি কৃত্রিম সংক্ষিপ্ত রূপ।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাক্টিভিস্ট আফসার তার ফেসবুক পেজ ‘আফসারস কোয়েস্ট’-এ লিখেছেন, ‘ভারতের দেশভাগই মূলত জিন্নাহর প্রতি ঘৃণার মূল কারণ। জিন্নাহ অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছিলেন। জিন্নাহর কারণেই আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘সংকির্ণমনা মুজিব অনুসারীরা জিন্নাহকে এমন এক ব্যক্তিতে পরিণত করেছে যিনি বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছিলেন।’

এই মন্তব্যগুলো জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাস এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে তার দূরত্ব নিয়ে এক পাল্টা আলোচনার জন্ম দেয়।

লেখক ও গবেষক আসিফ বিন আলী লিখেছেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না কেন জামায়াত-শিবির হঠাৎ তাকে “পিতা” বলতে শুরু করল। বাংলাদেশে মওদুদীর রাজনীতি কি এতটাই নিঃশেষ হয়ে গেছে যে এখন জিন্নাহকে নতুন করে আমদানি করতে হচ্ছে?’

আরও পড়ুন

অ্যাক্টিভিস্ট সুদীপ্ত বিশ্বাস বিভু প্রশ্ন তোলেন, কেন ইনকিলাব মঞ্চ এবং জামায়াত-শিবিরের অন্যরা জিন্নাহকে ‘পিতার আসনে’ বসিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলায় ‘পাকিস্তানি আদর্শ’, ‘পাকিস্তানি চিন্তাভাবনা’ এবং ‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি’ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘জিন্নাহ তো কেবল একটি অজুহাত।’

বাঙালি রাজনৈতিক ইতিহাসে জিন্নাহর স্থান ১৯৪৮ সাল থেকেই বিতর্কিত। ওই বছরের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে বক্তব্য দেন, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ বাঙালিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ভাষা অধিকারের এই আন্দোলনই পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রূপ নেয়।

অধ্যাপক মামুন বলেন, ‘উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কথা বলার পর, তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে জিন্নাহ যে রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছিলেন, পরবর্তীতে সেটাই তাকে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।’

মুক্তিযুদ্ধের ২৩ বছর আগে, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহ মারা যান।

মামুন জানান, বর্তমান বিতর্ককে বরং শেখ মুজিবুর রহমানকে আড়াল করে আরেকটি রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে, যাকে তিনি স্বাধীনতার স্থপতি এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত হিসেবে বর্ণনা করেন।

সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী নুমান আহমেদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, যারা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তারা ডাকসুতে ক্ষমতায় এসেছে এবং তাদের ‘মূল পিতা’ গোলাম আযমের ‘পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’র পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সেই জঘন্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবেই তারা নতুন করে জিন্নাহর প্রশংসা শুরু করেছে।’

জিন্নাহ ভাষার ওপর আঘাতের মাধ্যমে বাঙালিদের মুক্তির সংগ্রামের ওপর প্রথম আক্রমণটি করেছিলেন, যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি বাঙালিদের নিজ ভাষায় কথা বলতে দিতে চাননি, তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চিতভাবেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করতেন; বাংলাদেশপন্থীদের মনে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

১৩ সেপ্টেম্বর সংস্কারের পর ডাকসুর সংগ্রহশালা নতুন করে খোলার পর বিতর্কটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সেখানে গিয়ে গড়ায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। একটি ছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের। আরেকটি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে জিন্নাহ এবং অন্যান্য নেতাদের। তৃতীয়টি ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ওপর ‘ডন’ পত্রিকার একটি কাটিং, যার ২২ বছর আগেই জিন্নাহ মারা গিয়েছিলেন।

সংগ্রহশালায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন পর্যন্ত ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।

তবে সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের আলাদা বা একক কোনো উল্লেখযোগ্য ছবি নেই। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কিত কোনো বিভাগেই তার কোনো ছবি দেখা যায়নি।

১৯৪৭-১৯৭১ বিভাগে শেখ মুজিব কেন অনুপস্থিত, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মনে হয়নি, তাই আমি দিইনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আবু তৈয়ব হাবিলদার পরবর্তীতে ছবি তিনটি ছিঁড়ে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘ডাকসু কেন জিন্নাহর এসব ছবি টাঙিয়েছে? সাদিক কায়েম, আপনারা কি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চান?’

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বর্তমান ডাকসু নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ত্যাগ করার এবং ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি ও ‘পাকিস্তানের প্রতি সুপ্ত ভালোবাসা’ প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছে।

সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় জানান, ডাকসু সংগ্রহশালায় কোনো বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি প্রদর্শন করা একটি ‘নৈতিক অবক্ষয়’।

মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী কল্যাণী ঘোষ বলেন, ‘কেউ কেউ ঐতিহাসিক সত্যকে গোপন করে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও জিন্নাহ এবং তখনকার জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’।

ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীরাই আল-বদর কিলিং স্কোয়াড গঠন করেছিল। এই সংগঠনের নেতাকর্মীরাই ১৯৭৮ সালে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠা করে। জামায়াতও মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছিল।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর