ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখা দখলের পর লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা।
বৃহস্পতিবার হুথিরা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপের দিকে এগিয়ে যায় বলে ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্র জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
মোখা দখলের পর হুথিরা বাব আল-মান্দেবের প্রবেশপথের কাছাকাছি অবস্থান নেওয়ায় ওই প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব আরও বেড়েছে বলে ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তারা হানিশ দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
হুথিরা যদি আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরমুজ প্রণালির বিপরীত পাশের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইরান বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। এতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথের একটিতে সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্র জানায়, সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা লোহিত সাগর উপকূল ধরে দক্ষিণে ধুবাবের দিকে সরে যাচ্ছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালির পাশে অবস্থিত ধুবাব এবং এর বিপরীতে থাকা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নৌপথটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেনে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া সব ধরনের জাহাজের জন্য লোহিত সাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেল পরিবহনে লোহিত সাগরের পথের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেন যুদ্ধ ‘নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে। মোখা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের প্রবেশমুখে তাদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট দে অর্টিজ হুথিদের ইরানের ‘এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই উত্তেজনা বৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য নয় এবং যারা এর পেছনে সহায়তা দিচ্ছে, এর পরিণতির দায় তাদেরও নিতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হুথিদের বিরুদ্ধে অবরোধ বা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইয়েমেনের সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। তারা সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিবৃতিতে হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
ইয়েমেন সরকার, ইরান ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্রে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, চলতি সপ্তাহে হুথিদের লোহিত সাগর উপকূল ধরে অগ্রসর হওয়ার পেছনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সরাসরি নির্দেশনা ছিল। তবে হুথিদের মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেছেন, তাদের অভিযান প্রতিরক্ষামূলক। ইয়েমেনে হামলা বন্ধ হলে এসব অভিযানও বন্ধ হবে বলে জানান তিনি।
হুথিদের অগ্রসর হওয়া এবং নৌপথে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দাম প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডি জানিয়েছে।
মার্চে ইসরায়েলে হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার পর জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে হুথিরা। চলতি মাসে তারা হামলা আরও বাড়িয়েছে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। হুথিদের হামলার মধ্যে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে ২৪ ঘণ্টায় চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ।
সংকট আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানের সতর্কবার্তার জবাবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ইরান হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।’
এদিকে চলতি বছরের শেষ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌযান চলাচল নিয়ে এটিই সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা।
বৃহস্পতিবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় হিজবুল্লাহসহ ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহনের প্রধান পথ ছিল হরমুজ প্রণালি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদে ওই প্রণালি দিয়ে চলাচলে সহায়তা করার ক্ষেত্রে তারা অগ্রগতি করেছে। তবে চলতি মাসে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় ধীরে ধীরে নৌপথটি পুনরায় চালুর সেই উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার মাত্র সাতটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা গত ১০ দিনের গড়ের প্রায় অর্ধেক।


