পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের হরমুজ প্রণালিতে সবচেয়ে বড় সংঘাতে জড়িয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইরানি হামলায় ১০টি তেলবাহী জাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলায় অন্তত পাঁচটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে নৌযানে পাল্টাপাল্টি হামলার এটিই সবচেয়ে বড় ঘটনা।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, হামলায় একটি জাহাজের অন্তত এক নাবিক নিহত হয়েছেন এবং আরেকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
ইরান বুধবার দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার পর হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)। তেহরান আরও দাবি করেছে, তারা জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
তবে জর্ডান জানিয়েছে, তারা ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে এবং এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সব মার্কিন সেনা নিরাপদে আছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই উপকূলের কাছে নোঙর করা তেলজাত পণ্যবাহী জাহাজ হারকিউলিস স্টারে হামলায় একজন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং আরেকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে জাহাজটি ভাড়া নেওয়া প্রতিষ্ঠান পেনিনসুলা। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা যুক্তরাজ্য সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা কেন্দ্র জানিয়েছে, ওই এলাকার কাছাকাছি একটি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একদিকে হেলে পড়েছিল।
ইরাকের দুই বন্দর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ নিউ অ্যান্ড্রোসে ইরাকের জলসীমায় ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। জাহাজটির ২২ জন নাবিকের কেউ হতাহত হননি।
যুক্তরাজ্য সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর উপসাগর ও ওমান উপসাগরে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। হামলায় কয়েকটি জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা হারিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির বন্দর কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা রাতভর পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছে। সেন্টকমের প্রকাশিত ভিডিওতে হামলার শিকার জাহাজগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখা যায় এবং পরে সেগুলো ডুবে যায়।
সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দুইবার মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করার পর এর জবাবে তারা হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
আইআরজিসি হুঁশিয়ারি করে বলেছে, ভবিষ্যতে আরও হামলা হলে তারা এর কঠোর জবাব দেবে। তারা শিগগিরই সমুদ্রে নতুন ও বিস্তৃত নিষিদ্ধ এলাকার মানচিত্র প্রকাশ করবে, যা পাকিস্তানের কাছাকাছি চাবাহার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তাদের নতুন নীতির আওতায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার জবাবে ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গত এক সপ্তাহে তারা এ ধরনের ১০টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানে হামলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা যতবার এমন করবে বা চেষ্টা করবে, ততবার তাদের তেলবাহী জাহাজ হারাতে হবে।’
ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, বুধবার রাতে দেশটির বন্দরনগরী জাস্কের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্র থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে বিস্ফোরণের উৎস বা কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে তেহরান। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান পার্টি ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নির্ধারিত হবে।
সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হবে, কারণ তারা আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। তারা মরিয়া হয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।’
সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বুধবার জানিয়েছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ হোয়াইট হাউসের শীর্ষ উপদেষ্টারা ব্যক্তিগত আলোচনায় ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, তারা এই পথে জাহাজ চলাচল বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবে চলতি মাসে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই অগ্রগতি থেমে গেছে।
জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিমবার্তি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। এর আগে ৩০ আগস্ট সংঘাত শুরুর আগের সপ্তাহে এই পথে দৈনিক ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হতো।


