চারলেনের মহাসড়ক। ছুটে চলছে বাস, ট্রাক, লরি ও ব্যক্তিগত গাড়ি। কিন্তু কুষ্টিয়া শহরের বিআরবি কেবলস এলাকায় এসেই হঠাৎ সংকুচিত হয়ে গেছে প্রশস্ত সড়ক। চারলেনের মহাসড়ক নেমে এসেছে দুই লেনে। প্রায় তিন বছর ধরে অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে সড়কের ৪৫০ মিটার অংশ। ফলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ ও যানবাহন।
আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ বন্ধ। কিন্তু থেমে নেই মহাসড়কের ব্যস্ততা। বরং দীর্ঘদিন ধরে চারলেনের মাঝখানে তৈরি হওয়া এই সংকীর্ণ অংশটি এখন পরিণত হয়েছে দুর্ঘটনার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে।
কুষ্টিয়া-খুলনা-চুয়াডাঙ্গা মহাসড়কের ত্রিমোহনী-বারখাদা থেকে বটতৈল মোড় পর্যন্ত অধিকাংশ অংশে চারলেনের কাজ শেষ হয়েছে। ফলে ওই অংশে যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করছে। কিন্তু বিআরবি কেবলসের সামনে পৌঁছালেই হঠাৎ দুই লেনে নেমে আসে সড়ক। এতে দূরপাল্লার যানবাহনের চালকদের অনেক সময় শেষ মুহূর্তে লেন পরিবর্তন করতে হচ্ছে। বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনের বেলায়ও এ অংশে যানবাহনের চাপ থাকে। সন্ধ্যার পর ঝুঁকি আরও বাড়ে। পর্যাপ্ত সড়কবাতি নেই, নেই দূর থেকে দৃশ্যমান সতর্কতামূলক সংকেত কিংবা কার্যকর লেন নির্দেশনা। ফলে হঠাৎ সড়ক সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছেন অপরিচিত চালকেরা।
স্থানীয়দের দাবি, এ অংশে ছোট-বড় দুর্ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট এখানে সড়ক দুর্ঘটনায় এক তরুণ নিহত হন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাক ও লরির মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেলের দুই আরোহী গুরুতর আহত হন। পরে তাদের একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
তবে সরকারি নথিতে থাকা এসব দুর্ঘটনাই পুরো চিত্র নয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায়ই এখানে যানবাহনের ধাক্কা, নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর অনেকগুলোই থানায় বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নথিভুক্ত হয় না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জগতি মৌজার ৯৯ শতক জমির মালিকানা এবং সেখানে ড্রেন নির্মাণকে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল হক এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ওই অংশে স্থিতাবস্থা জারি করে।
সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে স্থিতাবস্থার আদেশ আরও ছয় মাসের জন্য বহাল রাখে আদালত। ফলে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত ওই অংশে নির্মাণকাজ শুরুর সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে জানতে রিটকারী রেজাউল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঝুঁকিপূর্ণ এ অংশে দ্রুত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুষ্টিয়ার সদস্য মিজানুর রহমান লাকি বলেন, মামলা চলায় নির্মাণকাজ বন্ধ থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের চলাচল তো বন্ধ নেই। জননিরাপত্তার বিষয়টি এভাবে ফেলে রাখা যায় না। দ্রুত দৃশ্যমান সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, গতি নিয়ন্ত্রণসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার ইমন রুবেল বলেন, বছরের পর বছর হাইকোর্টের আদেশের দোহাই দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের অংশকে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রাখা মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চারলেনের সড়ক নির্মাণের নামে বছরের পর বছর একটি অংশ ফেলে রাখা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করছে, অথচ দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটার পর দায় নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
কুমারগাড়া এলাকার বাসিন্দা শাহেদ আলী বলেন, ‘এই জায়গায় এসে চারলেনের সড়ক হঠাৎ দুই লেনে পরিণত হওয়ায় চালকদের সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয়। অনেক সময় দ্রুতগতির গাড়ি শেষ মুহূর্তে লেন পরিবর্তন করে। রাতের বেলায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।’
এবিষয়ে কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনজুরুল করিম বলেন, আদালতের আদেশের কারণে সওজ চাইলেও ওই অংশে কোনো নির্মাণকাজ করতে পারছে না। তবে মামলা পরিচালনাকারী সরকারি আইনজীবীদের ভূমিকা কিংবা আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
অবশ্য সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে একটি ছোট দুঃখ প্রকাশ ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। কিন্তু ব্যস্ত মহাসড়কের ৪৫০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ অংশে শুধু একটি সাইনবোর্ড দিয়েই কি দায়িত্ব শেষ করা যায়-এ প্রশ্নই এখন বড় হয়ে ওঠেছে।


