ডেঙ্গুর বাড়বাড়ন্তে খুলনায় শয্যা সংকট, বিপাকে হাসপাতাল

ডেঙ্গুর বাড়বাড়ন্তে খুলনায় শয্যা সংকট, বিপাকে হাসপাতাল
খুলনায় ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ। ছবি: মোদাচ্ছের/টাইমস
Advertisement
Advertisement

আগস্টের শেষ সপ্তাহে যখন সুমন মল্লিকের তীব্র জ্বর আসে, তখন তিনি ভেবেছিলেন এটি সাধারণ কোনো জ্বর-কাশি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তার শরীর খুব বেশি খারাপ হয়ে পড়ে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় তার ডেঙ্গু হয়েছে। পরিবারের লোকেরা তাকে দ্রুত একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু সেখানে কোনো শয্যা খালি পাওয়া যায়নি।

একটি ছাপাখানার কর্মী সুমনকে বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পাঠান। কয়েক দিন চিকিৎসার পর তাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হলেও তিনি এখনো অনেক দুর্বল। তাকে পুরো এক মাস বাড়িতে বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

সুমনের এই ঘটনাই বলে দেয় খুলনা শহরের বর্তমান করুণ পরিস্থিতির কথা। সেখানে হু হু করে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকায় চিকিৎসা দিতে হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। সময়মতো চিকিৎসা পেতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

মাস্টার্স শিক্ষার্থী নোমান আহমেদকেও একই রকম কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ২৩ আগস্ট তার জ্বর আসে। পরিবার তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়, কিন্তু সেখানে কোনো সিট খালি ছিল না। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর অন্য একজন রোগী হাসপাতাল ছেড়ে গেলে তিনি ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।

খুলনা শহরজুড়ে এখন শত শত ডেঙ্গু রোগী ও তাদের পরিবার ঠিক এই ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে হাসপাতালে ঠাঁই নেই, অন্যদিকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করাও ঝুঁকিপূর্ণ–সব মিলিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে ছোট ছোট শিশু আছে এমন পরিবারগুলো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

খুলনা সুশীল সমাজের সদস্য সচিব মো. বাবুল হাওলাদার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন খুবই মারাত্মক রূপ নিয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে খুলনাকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় সব সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানো, অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করা এবং দরকার হলে বাড়তি ডাক্তার-নার্স বা জনবল আনা উচিত।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, ডেঙ্গু এখন পুরো খুলনা বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে। একসময় এই রোগ মূলত ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় বড় শহরে বেশি দেখা যেত, কিন্তু এখন তা বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।

গত কয়েক মাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনেকটা বেড়ে গেছে। খুলনা বিভাগে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে যেখানে ২ হাজার ৭১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, সেখানে শুধু আগস্ট মাসে  আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৭৪ জন। আগস্টের শুরুতে মৃতের সংখ্যা ছিল ৮ জন, যা মাত্র এক মাসের মধ্যে বেড়ে দাঁড়ায় ২০ জনে।

খুলনা বিভাগজুড়ে সবচেয়ে বেশি রোগী ধরা পড়েছে খুলনা জেলায়। এই জেলায় বছরের প্রথম সাত মাসে ৪২২ জন রোগী ভর্তি হলেও কেবল আগস্টে সেই সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০১ জনে। আশপাশের জেলাগুলো থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে খুলনা শহরে আসছেন, যার ফলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ আরও অনেক বেড়ে গেছে।

আরও পড়ুন

খুলনা সিটি করপোরেশন শহরের ১৭, ১৮, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৩০ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর ‘রেড জোন’ বা তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর আগে ২২, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছিল।

জরুরি পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলো শয্যার চরম সংকটে পড়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের বৃহস্পতিবারের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগজুড়ে নতুন করে ২৪৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ২০০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছেন ৪৭ জন।

খুলনা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক হোসেন আলী জানান, বর্তমানে তাদের হাসপাতালে ২ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা জায়গা না থাকায় তাদের অনেককেই সাধারণ অন্য ওয়ার্ডের রোগীদের সঙ্গে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন মো. শওকত আলী বলেন, উপজেলা থেকে রোগীদের শহরের হাসপাতালে পাঠাতে বাধ্য হওয়ায় শহরের হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হচ্ছে।

রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তের প্লাটিলেটের চাহিদাও অনেক বেড়ে গেছে। খুলনা ব্লাড ব্যাংকের আসাদ শেখ জানান, তারা প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন ডেঙ্গু রোগীর জন্য প্লাটিলেটের অনুরোধ পাচ্ছেন। তবে সুস্থ রক্তদাতার অভাবে রক্ত সংগ্রহ করাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও জানান, ‘অ্যাফারেসিস’ নামের একটি বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র একজন রক্তদাতার শরীর থেকেই ৩৫ থেকে ৪০ হাজার প্লাটিলেট সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যাগের অভাব থাকায় খুলনা মেডিকেল কলেজে এই সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বর্তমানে এই সুবিধাটি কেবল শহরের সিটি মেডিকেল হাসপাতালেই পাওয়া যাচ্ছে।

একই সময়ে খুলনাভিত্তিক নানা ফেসবুক গ্রুপেও রক্তের প্রয়োজন জানিয়ে সাধারণ মানুষের আকুতি ও পোস্ট অনেক বেড়ে গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার বলেন, এডিস মশার মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মশা ডিম পাড়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশের কারণে খুলনায় এই রোগ এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহসান হাবীব বলেন, জলবায়ুর ক্ষতিকর পরিবর্তন, যখন-তখন বৃষ্টিপাত, দীর্ঘমেয়াদী বর্ষাকাল এবং শহরের জলাবদ্ধতাই ডেঙ্গু বাড়ার মূল কারণ।

তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাস নিজের রূপ বদলে আরও শক্তিশালী হচ্ছে কি না, তা জানতে ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা দরকার।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, মশা মারার ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা খুব জরুরি। তিনি শহরের মানুষকে নিজ নিজ ঘরবাড়ি, ছাদ ও বারান্দায় যেন কোনোভাবে পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখার অনুরোধ জানান।

আগস্টের শুরু থেকে সিটি করপোরেশন মশার লার্ভা ধ্বংসের অভিযান, ফগিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আসছে। তবে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শরীফ শাম্মীউল ইসলাম জানান, শহরের প্রায় ৮০ হাজার বাড়ির মধ্যে ১০ থেকে ২০ হাজার বাড়িতে ছাদবাগান রয়েছে অথবা এমন সব জায়গা আছে যেখানে সহজে পৌঁছানো যায় না। ফলে পুরো শহরে নিয়মিত মশাবিরোধী নজরদারি চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর