আশঙ্কা ও আপত্তি সত্ত্বেও বিএনপি সরকার ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৪’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়ায় মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এই আইন পাস হলে প্রতিষ্ঠানটি আগের মতোই নখদন্তহীন হয়েই থাকবে।
সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশের মাধ্যমে যুক্ত করা মূল সুরক্ষা বা ক্ষমতাগুলো প্রস্তাবিত আইন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন দেওয়া খসড়ায় ২০০৯ সালের পুরোনো আইনের দুর্বলতাগুলোকেই বহাল রাখা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে রাষ্ট্রীয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের জন্য কমিশনকে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তবে নতুন খসড়ায় সেই ক্ষমতা রাখা হয়নি।
মানবাধিকার কর্মী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিযুক্ত সাবেক কমিশনার নূর খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, প্রস্তাবিত এই আইন কমিশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষমতাকে অনেকটাই সীমাবদ্ধ করে ফেলবে।
তিনি বলেন, ‘খসড়ায় যে ধরনের বিধান রাখা হয়েছে, তাতে মানবাধিকার কমিশনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।’
নতুন খসড়া অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত কমিশন সরাসরি করতে পারবে না। উল্টো সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা পুলিশের কাছেই এই বিষয়ে প্রতিবেদন চাইতে হবে।
খসড়ায় কমিশনের পাঠানো চিঠির জবাব দিতে সরকারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারিত রাখা হয়নি। তবে উত্তর সন্তোষজনক না হলে কিছু ক্ষেত্রে কমিশন পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে।
নূর খান আরও বলেন, ‘অতীতেও ঠিক এই একই কারণে কমিশন মানবাধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছিল।’
অতীতের সীমাবদ্ধতা
সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করে আওয়ামী লীগ সরকার। তবে দীর্ঘ ১৭ বছর পার হলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কমিশন ‘এ’ স্ট্যাটাস বা মর্যাদা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বেআইনি আটক ও গুমের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ ওঠে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কমিশনে অভিযোগ জানিয়েও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো সুরাহা মেলেনি।
২০১০ সালে কমিশনের নিজস্ব এক মূল্যায়নেই বলা হয়েছিল, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে নির্যাতনের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্তে তাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তৎকালীন কমিশন ভেঙে দেয়। পরে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে নতুন করে এটি পুনর্গঠন করা হয়।
ওই অধ্যাদেশে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গুমের অভিযোগ সরাসরি তদন্ত করার পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল।
পাশাপাশি পূর্বানুমতি ছাড়াই কমিশনকে কারাগার, আটক কেন্দ্র, নিরাপত্তা হেফাজত ও গোপন বন্দিশালাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
অধ্যাদেশে কমিশনের নির্দেশ মানা বাধ্যতামূলক এবং আইন অমান্যকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান যুক্ত ছিল।
তবে বিএনপি সরকার সংসদে এই অধ্যাদেশকে অনুমোদন না দিয়ে নতুন আইন প্রণয়নের আগে এটি পর্যালোচনা করার ঘোষণা দিলে উদ্বেগ দেখা দেয়।
গত ১৭ মে প্রকাশিত নতুন আইনের খসড়ায় তদন্তের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়। এ ছাড়া কমিশনের কাঠামো, নিয়োগ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও তদন্তের ওপর সরকারি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রাখা হয়।
গত ১০ জুন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, এ ধরনের বিধান অপরিবর্তিত থাকলে মানবাধিকার কমিশন কোনোভাবেই কার্যকর হতে পারবে না।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিযুক্ত কমিশনার ইলিয়া দেওয়ান টাইমসকে জানান, প্রস্তাবিত আইনটিতে মূলত ২০০৯ সালের মূল কাঠামোই বহাল রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি শুধু এই মন্তব্যটুকুই করতে চাই যে, ২০০৯ সালের আইনটিই রেখে দেওয়া হয়েছে। কেবল সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যার একটি হলো সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা।’
নূর খান বলেন, ‘খসড়ায় বেশ কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে। এই পাঁচ সদস্যের কমিশনের ওপর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকবে।’
তবে তিনি জানান, ২০০৯ সালের আইনের তুলনায় প্রস্তাবিত খসড়ায় কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে।
তিনি বলেন, নিয়োগের বাছাই প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা অনগ্রসর সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, সার্চ কমিটি প্রতিটি পদের জন্য দুটি করে নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। স্পিকারের নেতৃত্বে গঠিত নয় সদস্যের একটি কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হবে।
পাঁচ সদস্যের এই কমিশনে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের যোগ্য প্রার্থীরা নিয়োগে অগ্রাধিকার পাবেন।
টিআইবি উল্লেখ করে, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিসভা সচিব অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এতে অন্তত আরও দুজন সদস্য মনোনয়নে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকায় কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের আধিপত্য বজায় থাকার ঝুঁকি রয়ে যাবে।
আগামী ২৭ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৪’ উত্থাপিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।


