বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল, প্রাথমিক তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
ঢাকার উত্তরায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল বা ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারক। শনিবার সকালে তারা র্যাব-১ সদর দপ্তরে অবস্থিত গোপন বন্দিশালাটি পরিদর্শন করেন।
এ সময় ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, সহিদুল ইসলাম সরদার, শেখ মইনুল করিম ও তাসমিরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশন দলের সদস্যরা।
পরিদর্শনে আরও অংশ নেন গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন ও আমির হোসেন।
২১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল-১ এই পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই দিন র্যাব, ডিজিএফআই ও ডিবির গোপন বন্দিশালা পরিদর্শনের আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী মতাদর্শের লোকজনকে এসব স্থানে তুলে নিয়ে আটকে রাখা, নির্যাতন ও গুম করার অভিযোগও তিনি ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে যে, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে আয়নাঘরের (টিএফআই সেল) একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কক্ষটি শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধি, রোম সংবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতেই এই বিচারিক পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, ভবনটি পরিদর্শনের সময় মোট ২৯টি ছোট-বড় কক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কয়েকটি কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব কক্ষে ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে দীর্ঘ সময়, কখনো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, এসব ব্যক্তির ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেককে পরে বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হলেও অনেকে আর ফিরে আসেননি।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীও রয়েছেন। গত বছরের আগস্টের পর কয়েকজন ভুক্তভোগী ফিরে এসে যে বর্ণনা দিয়েছেন, সেগুলোর সঙ্গে ঘটনাস্থলের বিভিন্ন অংশ মিলিয়ে আয়নাঘরের নির্দিষ্ট কয়েকটি কক্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্যারিস্টার আরমান যে কক্ষে আটক ছিলেন বলে বর্ণনা দিয়েছেন, সেটিও তদন্তকারীরা শনাক্ত করেছেন বলে জানান আমিনুল ইসলাম।
আটক ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা না দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা এবং গ্রেপ্তারের কারণ জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই ধরনের বিধান রয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারায়। কিন্তু আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব সাংবিধানিক ও আইনি বিধান অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। এসব অভিযোগে ইতোমধ্যে বিচার চলছে এবং আরও অনেক ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পরিদর্শনের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল তুলে পুরোনো কাঠামো আড়াল করার চেষ্টার আলামত পাওয়া গেছে বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, তদন্তের শুরুর দিকে ঘটনাস্থলের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের দেওয়া বর্ণনার মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তদন্তকারীদের সন্দেহ হলে কয়েকটি স্থানে নতুন করে নির্মিত দেয়াল অপসারণ করা হয়। তখন আড়ালে থাকা কক্ষগুলো পাওয়া যায় এবং সেখানে বিভিন্ন আলামত শনাক্ত করা হয় বলে জানান তিনি।
ভবনের নিচতলায় একটি কক্ষকে ভুক্তভোগীরা ‘ডেথ সেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলেও জানান আমিনুল ইসলাম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিচতলা ও ওপরতলা মিলিয়ে মোট ২৯টি কক্ষ পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় কোনো বৈধ প্রয়োজনে ব্যবহার না হলে এতগুলো ছোট কক্ষ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল, তার জবাব সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যারা পরবর্তী সময়ে দেয়াল তুলে বা নতুন নির্মাণের মাধ্যমে এসব কক্ষের অস্তিত্ব আড়াল করার চেষ্টা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি জানান, প্রমাণ নষ্ট বা আড়াল করার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে বিচার পরিচালনায় প্রসিকিউশন অঙ্গীকারবদ্ধ। আয়নাঘর পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর বাস্তব চিত্র কোনো ‘রূপকথার গল্প’ নয়, বরং একটি ভয়াবহ বাস্তবতা।
এসব কর্মকাণ্ডের দায় শুধু মাঠপর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যারা সরাসরি এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তাদের পাশাপাশি যাদের নির্দেশে এসব হয়েছে এবং সে সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ও ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ নীতির আওতায় তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই তদন্তে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।


