কানাডার দাবানলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি শুল্ক দিয়ে উসুলের হুমকি ট্রাম্পের

কানাডার দাবানলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি শুল্ক দিয়ে উসুলের হুমকি ট্রাম্পের
হেলিকপ্টারের সাহায্যে দাবানল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে দেশটির সরকারকে দায়ী করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দূষণ মোকাবিলার ‘সব ব্যয়ের হিসাব’ কানাডীয় পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে যোগ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, কানাডায় জ্বলতে থাকা কয়েক শ দাবানলের ঘন কালো ধোঁয়া বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত পুরো এলাকা ঢেকে ফেলে। এর ফলে তীব্র বায়ু দূষণ থেকে বাঁচতে মার্কিন বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার অবস্থান নেওয়ার সতর্কতা জারি করা হয়।

এ পরিস্থতিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাদের দুজনের সম্পর্কও বেশ বিরোধপূর্ণ। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্নি কী করার পরিকল্পনা করছেন, তা জানতে তিনি তাকে ফোন করবেন।

রোববার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে ট্রাম্প ও কার্নির দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কানাডা যথাযথভাবে তাদের বনাঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণ করছে না। এর ফলে নোংরা, দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বাতাস অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে পড়ছে। এ জন্য আমরা কানাডাকে দায়ী করছি।’

‘এটি ইচ্ছাকৃত অবহেলা এবং প্রতিবছরের ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। তাই এ দূষণের ব্যয় অবশ্যই কানাডা বর্তমানে যে শুল্ক দিচ্ছে, তার সঙ্গে যোগ করতে হবে’, হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই কানাডা থেকে আমদানি করা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। সেই থেকে দুই মিত্র দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব শুরু হয়।

কানাডার দাবানলের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রেও। ছবি: এপি/ইউএনবি

অন্যদিকে কানাডার জরুরি ব্যবস্থাপনা ও জনপদের দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতাবিষয়ক মন্ত্রী এলেনর ওলশেভস্কি বলেছেন, ক্রমবর্ধমান শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়ার মুখে সরকার ২০২০ সাল থেকে বনাঞ্চলের স্থায়িত্ব ও অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে এক হাজার ২০০ কোটি কানাডীয় ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর পরিমাণ প্রায় ৮৫৬ কোটি মার্কিন ডলার।

সীমান্তের দুই পাশে দাবানল মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

এক বিবৃতিতে ওলশেভস্কি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো কানাডার নাগরিকদের রক্ষা করা এবং জনপদগুলোকে নিরাপদ ও টিকিয়ে রাখা।’

আরও পড়ুন

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কানাডার বনাঞ্চলের কাঠ আরও শুষ্ক হয়ে পড়ছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানলের সংখ্যা বেড়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম বনভূমিগুলোর কয়েকটি কানাডায় অবস্থিত।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার থম্পসন রিভার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বনাঞ্চলের দাবানলবিষয়ক অধ্যাপক মাইক ফ্ল্যানিগান বলেন, ‘আমাদের জলবায়ু যত উষ্ণ হচ্ছে, তত বেশি চরম আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। সামনে আমরা আরও বেশি দাবানল দেখতে পাব।’

ট্রাম্পের মন্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির কার্যালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।

অবশ্য কার্নি বৃহস্পতিবার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি কিছু করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চলতি বছর কানাডার অন্টারিও প্রদেশে অনেকগুলো দাবানলের ঘটনা ঘটে। এসব আগুনের অধিকাংশই প্রত্যন্ত ও জনবিরল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ এলাকাগুলোতে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম আকাশপথ।

কানাডা সরকারের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক দাবানলে এ পর্যন্ত ছয় লাখ ৫০ হাজার একর বা দুই হাজার ৬৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুড়ে গেছে। গত বছর একই সময়ে পুড়েছিল ছয় লাখ একর এলাকা।

দাবানলের কারণে এরইমধ্যে আশপাশের কয়েক হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরপরও উত্তর-পশ্চিম অন্টারিওর নামাইগুসিসাগাগান আদিবাসী জনপদ বা কলিন্স আদিবাসী জনপদ আগুনে পুড়ে গেছে।

স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ম্যাথিউ হোপ জানান, জনপদটির বাসিন্দারা নৌকায় করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন এবং থান্ডার বেতে আশ্রয় নেন।

তিনি বলেন, ‘সেখানে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ফলে জনপদের বাসিন্দারা পুরোপুরি বিপর্যস্ত, হতাশ, দিশাহারা ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।’

দাবানলের ধোঁয়া গ্রাস করেছে গোটা অন্টারিও প্রদেশকে। ছবি: এপি/ইউএনবি

সুপিরিয়র হ্রদের উত্তর তীরে অবস্থিত থান্ডার বে শহরের জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ ১০ হাজার। শহরটি টরন্টো থেকে এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার বা ৮০০ মাইলের বেশি উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।

উত্তর-পশ্চিম অন্টারিওর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দাবানলে বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিতে গিয়ে থান্ডার বে শহরের ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন শহরটির মেয়র কেন বশকফ।

অন্টারিওর মুখ্যমন্ত্রী ডাগ ফোর্ড শুক্রবার বলেন, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া দাবানল মোকাবিলায় প্রদেশ সরকার ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কিনবে। দাবানল মোকাবিলায় কানাডার পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনা করা মার্কিন রাজনীতিকদের বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

কেবল কানাডাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও চলতি বছর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দাবানল দেখা যাচ্ছে।

দেশটির জাতীয় আন্তঃসংস্থা অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ৩৭ লাখ একর এলাকা পুড়ে গেছে। অথচ গত ১০ বছরের গড় অনুযায়ী একই সময়ে সাধারণত ২৭ লাখ একর এলাকায় দাবানল হয়ে থাকে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad