মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে অস্ত্র নয়, পুতুলকে হাতিয়ার বানিয়ে শরণার্থী শিবিরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সাহস, আশা আর হাসি। সেই বরেণ্য চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার আজ আর নেই।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতজুড়ে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে তিনি পাপেট শো পরিবেশন করতেন। যুদ্ধের বিভীষিকায় বিপর্যস্ত নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের হতাশা কাটাতে তার এই উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন সেই পাপেট শোগুলোর দৃশ্য ধারণ করেন। পরবর্তীতে তারেক মাসুদ নির্মিত মুক্তির গান-এ সেই ঐতিহাসিক পরিবেশনার কিছু অংশ স্থান পায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তার জনপ্রিয় পাপেট গল্পগুলোর একটি ছিল ‘আগাছা’। গল্পে দেখা যায়, এক কৃষককে পাকবাহিনী জিজ্ঞাসা করে মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় থাকে। উত্তরে কৃষক বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা বাস করেন প্রতিটি বাঙালির বুকের ভেতর। এই প্রতীকী গল্প শরণার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও সংগ্রামের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী এক সাক্ষাৎকারে মুস্তাফা মনোয়ার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, শরণার্থী ক্যাম্পে একটি কালো কাপড় টাঙিয়ে পাপেট শো আয়োজন করা হতো। সেখানে পুতুলের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খান-কে ব্যঙ্গ করা হলে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই হাসিতে ফেটে পড়তেন। সেই হাসির মধ্য দিয়েই তারা দুঃসময় ভুলে সাহস ফিরে পেতেন এবং দখলদার শাসকের প্রতি নিজেদের ঘৃণা প্রকাশ করতেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সেই ‘পুতুলওয়ালা’ আজ চিরবিদায় নিয়েছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।


