‘সীমান্ত হাট’: ভালো উদ্যোগ হলেও বাস্তবে কাজে দেয়নি

‘সীমান্ত হাট’: ভালো উদ্যোগ হলেও বাস্তবে কাজে দেয়নি
বন্ধ হয়ে থাকা ফেনীর ছাগলনাইয়া সীমান্তের বর্ডার হাট। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ক্ষুদ্র বাণিজ্য বাড়াতে চালু হওয়া ‘সীমান্ত হাট’ বা ‘বর্ডার হাট’-এর কার্যক্রম এখন পুরোপুরি বন্ধ। ভারতের একতরফা নীতি, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের প্রতি বৈষম্য ও রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে বন্ধ হওয়া এসব হাট চালুর বিষয়ে সরকারের এখন কোনো উদ্যোগ নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) শাখার উপসচিব ফারহানা ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, সীমান্ত হাট সচল ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিশেষ পরিস্থিতির কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এটি পুনরায় চালু করার বিষয়ে এখন কোনো আলোচনা নেই।

একই মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ছাড়া এই হাটগুলো চালু করা সম্ভব নয়। তাই সরকার আপাতত এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

এদিকে সীমান্ত হাট চালুর আগে এটিকে সীমান্ত অর্থনীতির জন্য বড় উদ্যোগ বলা হলেও বাস্তবে তেমন সফলতা আসেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির টাইমসকে বলেন, সীমান্তে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ও বাণিজ্যের প্রসারে পৃথিবীর অনেক দেশেই সীমান্ত হাট চালু থাকে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাটগুলো খুব একটা কাজে না আসলেও এগুলো সীমান্ত এলাকার নাজুক অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তাই পারস্পরিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়াতে বন্ধ হাটগুলো আবার চালু করা উচিত।

তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় এই হাটগুলো পুনরায় চালু করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সীমান্ত হাটের উদ্দেশ্য কী ছিল

সীমান্ত এলাকার মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য সহজে কেনাবেচার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল সীমান্ত হাট চালুর প্রধান উদ্দেশ্য। এর পাশাপাশি লক্ষ্য ছিল সীমান্ত অঞ্চলে চোরাচালান কমানো, স্থানীয় কৃষিপণ্য ও ক্ষুদ্র শিল্পের বাজার তৈরি এবং মানুষের আয় বাড়ানো।

এছাড়া দুই দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ভালো করার একটি মাধ্যম হিসেবেও এটিকে দেখা হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, সীমিত কর্মসংস্থানের এই অঞ্চলে সীমান্ত হাট স্থানীয় অর্থনীতিতে ভালো প্রভাব ফেলবে।

সীমান্ত হাট চালু হয়েছিল যেভাবে

আরও পড়ুন

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুই দেশের সীমান্তে মোট সাতটি সীমান্ত হাট চালু করা হয়। যদিও সব মিলিয়ে ২২টি সীমান্ত হাট চালুর পরিকল্পনা ছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৩ জুলাই কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার বালিয়ামারী সীমান্তে প্রথম সীমান্ত হাট চালু হয়। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেন্দ্রগঞ্জ থানার সীমান্ত এলাকার সাথে মিলিয়ে এই হাটের নাম ছিল বালিয়ামারী-কালাইরচর সীমান্ত হাট।

এরপর ২০১২ সালের ২৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জের ডলুরা ও ভারতের বালাট সীমান্তে আরেকটি হাট চালু করা হয়। পরবর্তীতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সায়েদাবাদ এবং ভারতের মেঘালয় রাজ্যের নালিকাটা সীমান্ত এলাকায় সায়েদাবাদ-নালিকাটা সীমান্ত হাট চালু হয়।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৃষ্ণনগর সীমান্তকে কেন্দ্র করে আরেকটি হাট চালু হয়। একই বছরের জুনে চালু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তারাপুর এবং ত্রিপুরার আগরতলা সীমান্ত এলাকায় তারাপুর-কমলাসাগর সীমান্ত হাট।

এছাড়া সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাগানবাড়ি এবং ভারতের রিঙ্কু এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে বাগানবাড়ি-রিঙ্কু সীমান্ত হাট গড়ে ওঠে।

মেঘালয় ও ত্রিপুরা সীমান্তসংলগ্ন আরও কয়েকটি হাটও পরে চালু করা হলেও এখন একটিও সচল নেই। এই সীমান্ত হাটগুলোতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ৬৯টি পণ্য কেনাবেচার নিয়ম ছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প ও হালকা শিল্পজাত ৩৭টি পণ্য বিক্রির অনুমোদন ছিল।

করোনার পর রাজনৈতিক সংকট

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ে সব সীমান্ত হাট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কয়েকটি হাট সীমিত আকারে চালু হলেও কার্যক্রম আর আগের মতো পুরোপুরি স্বাভাবিক করা যায়নি। স্বাস্থ্যবিধি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে হাটের কার্যক্রম আটকে যায়।

এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সীমান্ত বাণিজ্যের ওপর। নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে হাটগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর ফেনীর ছাগলনাইয়া সীমান্ত হাটটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন সীমান্ত হাট চালু করা নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

পরিচালনায় বৈষম্যের অভিযোগ

সীমান্ত হাট পরিচালনায় শুরু থেকেই ছিল ভারতের একতরফা নিয়ন্ত্রণ ও বৈষম্যের অভিযোগ। নিয়ম অনুযায়ী দুই দেশের কমিটির যৌথভাবে বাজার চালানোর কথা থাকলেও বাস্তবে সবকিছু ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলত। বাংলাদেশি ক্রেতারা সহজে যাতায়াত করতে পারলেও ভারতীয় ক্রেতাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করত সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারতের প্রবেশ গেটে ওজন মাপার স্কেল ছিল। কোনো ভারতীয় ক্রেতা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাঁচ কেজির বেশি পণ্য কিনতে পারতেন না। অথচ বাংলাদেশি ক্রেতারা ভারতীয় অংশ থেকে অনেক বেশি পণ্য কিনে আনতে পারতেন।

ফেনীর ছাগলনাইয়া সীমান্ত হাটের ১ নং স্টলের মালিক আতাউর রহমান টাইমসকে বলেন, বাজারে পণ্য তোলার সময় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কঠোর তল্লাশি করা হতো। তারা তালিকার বাইরের কোনো পণ্য তুলতে পারতেন না। কিন্তু ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম অনেক শিথিল ছিল। এই বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

চালু করতে প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্ক

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত হাট ছিল দুই দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম। রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও এই হাটগুলোর কারণে সীমান্ত এলাকার মানুষ উপকৃত হচ্ছিলেন। তাই সীমান্ত হাট আবার চালু করতে হলে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়, বরং দরকার দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থা ও পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad