বাজেট গণবিরোধী ও ফাঁকা বুলি সর্বস্ব: এনসিপি

বাজেট গণবিরোধী ও ফাঁকা বুলি সর্বস্ব: এনসিপি
শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেটের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি একটি বিকল্প ছায়া বাজেট উপস্থাপন করে এনসিপি। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পেশ করা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে ‘অবাস্তব, গণবিরোধী ও ফাঁকা বুলি সর্বস্ব’ বলে আখ্যায়িত করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে বাজেটের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি একটি বিকল্প ছায়া বাজেট উপস্থাপন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান আতিক মুজাহিদ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

লিখিত বক্তব্যে আতিক মুজাহিদ বলেন, ‘দেশের চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি চরম অবাস্তব, গণবিরোধী ও ফাঁকা বুলি সর্বস্ব বাজেট পেশ করেছে।’
তিনি স্পষ্ট করেন, এনসিপির এই বিশ্লেষণ ‘বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়’, বরং এটি জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে করা হয়েছে।

এনসিপি জানায়, সরকার বাহবা কুড়াতে বিশাল এক ‘হাতির আকারের’ বাজেট ঘোষণা করেছে, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং গত বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বিগত বছরগুলোর বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বল ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৪-২৫-এর প্রকৃত ব্যয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১ শতাংশ কম ছিল।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এনবিআরের ঘাড়ে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি জনগণের পকেট কাটার নামান্তর।

সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করের বোঝা না চাপিয়ে তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন, লটারি ও প্রণোদনাভিত্তিক ভ্যাট সংগ্রহ, যাকাত অর্থনীতি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে কর কাঠামোর আওতায় আনার বিকল্প প্রস্তাব দেয় এনসিপি।

সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ), যা পূরণে ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আতিক মুজাহিদ বলেন, ‘এই বিশাল ব্যাংক ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণ সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমাবে।’

আরও পড়ুন

এর বিপরীতে এনসিপি তাদের ছায়া বাজেটে ব্যাংক ঋণ মাত্র ৮৫ হাজার কোটিতে সীমিত রাখার এবং বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ০৯ শতাংশ রাখার বৈপ্লবিক বিকল্প প্রস্তাব করেছে। ঘাটতি মেটাতে তারা ওয়াকফ সুকুক, গ্রিন বন্ড এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির (এসওই) তালিকাভুক্তির মতো নতুন উদ্ভাবনী উৎস থেকে অর্থায়নের পথ দেখিয়েছে।

শিক্ষাখাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব এবং মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার মতো ইতিবাচক দিকগুলোর প্রশংসা করলেও এনসিপি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।

দলটির ছায়া বাজেটে শিক্ষাখাতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি ৫ হাজার কোটি টাকার শিক্ষক গুণমান তহবিল এবং প্রথম বছরে ৫ হাজার এমপিও স্কুল জাতীয়করণের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে আউট অব পকেট ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ (৬০ শতাংশের বেশি) হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় স্বাস্থ্য বিমার কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় সমালোচনা করা হয়। এনসিপি তাদের ছায়া বাজেটে ৫২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি ৪ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের মহাপরিকল্পনায় দুটি সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল, ৫০০ জিপিএস ট্র্যাকড অ্যাম্বুলেন্স চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং পাঁচটি জেলায় জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা পাইলট চালুর কথা বলেছে।

সরকার কর্মসংস্থানকে কেন্দ্রবিন্দু ঘোষণা করলেও কোনো নির্দিষ্ট চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা দিতে পারেনি। এনসিপি তাদের ছায়া বাজেটে পাঁচ বছরে ১ কোটি শোভন কর্মসংস্থান এবং চলতি অর্থবছরে ২০ লাখ নতুন আনুষ্ঠানিক চাকরির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ (এনপিএল) ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বেচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনের অনুপস্থিতির সমালোচনা করা হয়। এনসিপি ছয় মাসের মধ্যে একিউআর ফলাফল প্রকাশ এবং ৫ হাজার কোটি মূলধনে ‘ব্যাড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠনের দাবি জানায়।

বাজেটে ক্ষুদ্র ও খুচরা দোকানদারদের ওপর জোরপূর্বক টার্নওভার ট্যাক্স চাপানোর তীব্র বিরোধিতা করে এনসিপি অবিলম্বে এই ‘কালো ট্যাক্স’ বাতিলের দাবি জানিয়েছে এবং বিক্রির পরিবর্তে প্রফিটের ওপর ট্যাক্স আদায়ের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের বাঁচাতে প্রতিটি অঞ্চলে ‘ক্রপ সেল সেন্টার’ স্থাপনের দাবি করা হয়।

এনসিপি আরও সাত দফা দাবি জানিয়েছে। সেগুলো হলো-রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি এবং স্বেচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আইনের কঠোরতম বাস্তবায়ন; পাইলট কর্মসূচি শুরুর সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় তারিখ ঘোষণা; সরকারি নতুন বেতন কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য, বিশেষত নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ স্পষ্ট করা; মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর থেকে করের বোঝা কমাতে আগামী দুই বছরের স্পষ্ট রোডম্যাপ; স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভ্যাট মওকুফ অবিলম্বে কার্যকর করা; ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠন এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং সরকারি লুটপাট বন্ধে রিয়েল-টাইমে সরকারি ব্যয় প্রদর্শনের জন্য ‘হিসাব দাও পোর্টাল’ চালু করা।

সংবাদ সম্মেলনে আতিক মুজাহিদ বলেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি এই বাজেটকে দেখছে একটি সদিচ্ছাপূর্ণ কিন্তু অসম্পূর্ণ দলিল হিসেবে। বাংলাদেশের জনগণ একটি সৎ, দায়িত্বশীল ও বাস্তবসম্মত বাজেট প্রাপ্য এবং সেই ন্যায্য বাজেটের জন্য আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad