নওগাঁর চাকরাইল আড়তে কুরবানির পশুর চামড়া সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না। ঢাকার ট্যানারি মালিকরা না আসায় ঈদের পর চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। এতে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকায় সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে পানির দরে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
ঈদুল আজহা পরবর্তী সময়ে বদলগাছী উপজেলার চাকরাইল আড়তে কুরবানির পশুর চামড়ার সরবরাহ কম ছিল। জেলায় চামড়ার দুটি আড়তের মধ্যে এটি অন্যতম। সপ্তাহে প্রতি বুধবার এ আড়তে সারা বছরই কমবেশি চামড়া কেনাবেচা হলেও কুরবানির পর ভিড় বাড়ে। ভোরের আলো ফোটার পর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট ও বগুড়ার আদমদীঘি এবং ঢাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন।
তবে এবার ঈদের পর আড়তে চামড়া বেচাকেনা জমে ওঠেনি। সীমিত চামড়া নিয়ে ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এলেও সরকার নির্ধারিত দাম পাননি। ঢাকা থেকে মাত্র একজন ট্যানারি প্রতিনিধি এসেছেন, তবে তিনি কথা বলতে চাননি। বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকায় তিনি কম দামে চামড়া কিনছেন। ফলে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
আড়তে ছাগল ও ভেড়ার চামড়া মানভেদে পিসপ্রতি ২০ থেকে ৭০ টাকা এবং গরু ও মহিষের চামড়া ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। লবণের দাম বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি হওয়ায় চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চামড়া শিল্পকে রক্ষায় সরকারকে আরও আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় এবার চামড়া লবণজাত করতে খরচ বেশি পড়েছে। ঢাকার ব্যবসায়ীরা না আসায় এবং চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় সিন্ডিকেটের কারণে লোকসানে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে।
সদর উপজেলার গোস্তহাটি মোড়ের চামড়া ব্যবসায়ী মাসুদ খান রানা বলেন, ‘সরকার ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা ও বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। সেই অনুযায়ী ১০০ পিস গরুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছি। কাঁচা চামড়ায় লবণ দিয়ে বিক্রি করতে এসে দেখি প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লবণযুক্ত গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫৫০ টাকা পিস, যা ১ হাজার টাকার ওপরে বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। ঢাকা থেকে একজন ব্যবসায়ী এসে কম দামে চামড়া কিনছেন। এটি সিন্ডিকেট, এ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা থেকে বেশি ব্যবসায়ী এলে দাম কিছুটা বাড়ত।’
মহাদেবপুর উপজেলার বিনোদপুর গ্রামের মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, ‘কুরবানিতে ৮০ পিস গরু, ৮০ পিস ছাগল ও ১০ পিস ভেড়ার চামড়া ৪৭ হাজার টাকায় কিনেছি। এর সঙ্গে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহনে খরচ পড়েছে আরও ১০ হাজার টাকা। আড়তে দাম হাঁকছে ৩২ থেকে ৩৩ হাজার টাকা। এই দামে বিক্রি করলে বড় লোকসান গুনতে হবে।’
জয়পুরহাট থেকে আসা ব্যবসায়ী পাভেল বলেন, ‘ব্যবসা সন্তোষজনক মনে হচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত দাম পাচ্ছি না। গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর ছাগলের চামড়ার দাম পানির দর। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
পত্নীতলা উপজেলার শিবপুর গ্রামের চামড়া ব্যবসায়ী শাহীদ রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গরুর প্রতিটি চামড়ায় লবণ ও শ্রমিক খরচ পড়ে ১০০ টাকা, ছাগলের চামড়ায় খরচ ২০ টাকা। আমরা ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে দাবি, বাইরের দেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি যেন সরকারিভাবে চামড়া সংগ্রহের দাম নির্ধারণ না করেন।’
চাকরাইল চামড়া আড়তের আহ্বায়ক ও জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ঈদের পর আড়তে আশানুরূপ চামড়া আসেনি। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া আনেননি। আমাদের আশা ছিল ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকার চামড়া আসবে। কিন্তু ১৪ থেকে ১৫ লক্ষাধিক টাকার চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। ঢাকার ব্যবসায়ীরা না আসায় বাজারে ধস নেমেছে। বেশি দামে চামড়া কিনে আমাদের কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’


