ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
আগামী শনিবার এই শোক পালন করা হবে বলে বৃহস্পতিবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জানান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
এর আগে বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১০টায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ওসমান হাদি। গত সোমবার থেকে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণার খবর জানাতে রাত ১১টা ২০ মিনিটে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান আমাকে টেলিফোনে এই হৃদয়বিদারক সংবাদটি জানিয়েছেন। ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এই অমর সৈনিককে মহান রাব্বুল আলামিন শহিদ হিসেবে কবুল করুন, এই দোয়া করি। আমরা সবাই মিলে এই দোয়া করি।’
শরিফ ওসমান হাদির অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে মুহাম্মদ ইউনূস জানান, হাদির স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের দায়িত্ব নেবে সরকার।
তার মৃত্যুতে আগামী শনিবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ উপলক্ষে সেদিন দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।’
‘একইসঙ্গে শুক্রবার বাদ জুমা দেশের প্রতিটি মসজিদে শহিদ ওসমান হাদির রূহের মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হবে। আপনারা তাতে শরিক হোন। অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়গুলোতেও আয়োজন হবে বিশেষ প্রার্থনার।’
ভাষণে সিঙ্গাপুর সরকারের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান প্রধান উপদেষ্টা। বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণানের প্রতি। যিনি একজন চিকিৎসক এবং নিজেই হাদির পরিচর্যা করেছেন, প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়মিত চিকিৎসা সম্পর্কে খোঁজখবরও দিয়েছেন।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে জানিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হবে না।’
‘বিপ্লবী রক্তে উজ্জীবিত এই তরুণ নেতা ওসমান হাদি ছিলেন প্রতিবাদের অনন্য প্রতীক। তার কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু প্রতিবাদ নয়, দেশপ্রেম, ধৈর্য ও দৃঢ়তার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।’
এ পরিস্থিতিতে দেশের নাগরিকদের ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখতে আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্বের সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ দিন। রাষ্ট্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি আবারও স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ওসমান হাদি ছিলেন পরাজিত শক্তি ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের শত্রু। তার কণ্ঠ স্তব্ধ করে বিপ্লবীদের ভয় দেখানোর অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। ভয়, সন্ত্রাস কিংবা রক্তপাতের মাধ্যমে এ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।’
বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক উত্তরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘শহীদ হাদি ছিলেন এই প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার একান্ত ইচ্ছা ছিল আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরবর্তী ধাপে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।’
‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তার এই মহতী ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে গেল। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায় আজ সমগ্র জাতির কাঁধে ন্যস্ত। আগামী দিনগুলোতে আমাদের সবাইকে ধৈর্য, সংযম, সাহস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের শত্রু ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী অপশক্তিকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা যায়।’
শরিফ ওসমান হাদির আদর্শ ও ত্যাগকে শক্তিতে পরিণত করতে আহ্বান জানিয়ে দেশের মানুষের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আসুন আমরা ধৈর্য ধারণ করি, অপপ্রচার ও গুজবে কান না দিই এবং যে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকি।’
‘যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চান, তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে অবিচল পদক্ষেপে এগিয়ে যাই। এটাই হবে শহীদ হাদির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।’


