উন্নয়ন টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান

উন্নয়ন টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান
ছবি: পিআইডি
Advertisement
Advertisement

দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে টেকসই করতে গণতন্ত্র, স্বাধীন সাংবাদিকতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিকেরা।

তাদের মতে, এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।

রাজধানীর একটি হোটেলে ডাক্স ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস আয়োজিত বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৬-এর দ্বিতীয় দিনের প্যানেল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।

‘বাংলাদেশ অ্যান্ড আ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড: আনচার্টড টাইমস, ইমার্জিং অর্ডারস, অ্যান্ড দ্য পলিটিকস অব কেয়ার’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র, অর্থনীতি, ডিজিটাল শাসন, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

‘ডাজ সাউথ এশিয়াস প্রেস ফেস দ্য সেম থ্রেটস?’ শীর্ষক আলোচনায় হিমাল সাউথএশিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা কনক মনি দীক্ষিত বলেন, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনতে গিয়ে সাংবাদিকেরা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন, যা শুধু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য নয়, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের জন্যও হুমকি।

দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার বলেন, সাংবাদিকের কাজ কোনো পক্ষের মুখপাত্র হওয়া নয়; বরং সত্য অনুসন্ধান করা এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা। গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের বিকল্প নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, সিটিজেন জার্নালিজম ও মোবাইল জার্নালিজমের বিস্তারের ফলে সাংবাদিকতা নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সাংবাদিকেরা রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি অনলাইন হয়রানি ও জনআক্রমণের ঝুঁকিতেও পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সংবাদ সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয় আলোচনায়।

‘ফ্রম আইসিটি অ্যাক্ট টু সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স’ শীর্ষক আলোচনায় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান মো. মহিউল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তির নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে দেশে ডিজিটাল আচরণ নিয়ে জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে শক্তিশালী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তাকে ব্যবসায়িক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাড়ানোর কথাও বলেন।

আরও পড়ুন

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষক দিলশাদ হোসেন দোদুল বলেন, ডিজিটাল নীতি প্রণয়নের সময় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

আর প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন নাগরিককে নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, বরং তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য হওয়া উচিত। ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় কার্যকর সত্যতা যাচাই ব্যবস্থার বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি।

‘ক্রস-বাউন্ডারি ওয়াটার শেয়ারিং অ্যান্ড ন্যাচারাল রাইটস ইন দ্য বেঙ্গল ডেল্টা’ শীর্ষক আলোচনায় চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন খান বলেন, অভিন্ন নদীর নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় উজানের বিভিন্ন বাঁধ ও ব্যারেজ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে। তিনি নদীকে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সোনিয়া বিনতে মুরশেদ বলেন, আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা শুধু পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এটি পরিবেশগত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রশ্নও।

গ্রিন ওয়াচের সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে বন্যা, নদী অবক্ষয় ও উপকূলীয় সংকট বাড়ছে। তার ভাষায়, নদী নিজেরা মরে না, নদীকে হত্যা করা হয়।

ইন্টারন্যাশনাল ফারাক্কা কমিটির সভাপতি সৈয়দ টিপু সুলতান বলেন, আন্তসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে আরও দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।

‘হেলদি বাংলাদেশ ২০৪১’ শীর্ষক আলোচনায় স্কয়ার হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বলেন, জনসংখ্যার বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে ক্যানসারের প্রকোপও বাড়বে। তাই প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অধিকারকর্মী শামারুহ মির্জা বলেন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সুস্থ বার্ধক্যে বিনিয়োগ ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।

রেনাট পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ এস. কায়সার কবির বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গুরুতর অসুস্থতার কারণে কোনো পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে।

আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকি বলেন, রোগের আগাম সতর্কতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ এবং শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অর্থায়নের ঘাটতি দূর করা এবং শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

‘ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম, ব্যুরোক্রেটিক ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক কনসোলিডেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা বদলে ফেলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

ক্ষমতায় গিয়ে সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক অবস্থান বদলে যাওয়ার প্রবণতাও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংরক্ষিত মহিলা আসন-৯-এর সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো স্বাধীনভাবে সমালোচনা করতে পারছে।

ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি জন ফ্লুহার্টি বলেন, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার রাতারাতি সম্ভব নয়। এ জন্য সরকার, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের দীর্ঘমেয়াদি অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতা প্রয়োজন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad