ডিজেল সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দর। এই বন্দর দিয়ে ভারত থেকে একমাত্র আমদানিপণ্য পাথর আসলেও ডিজেলের অভাবে ট্রাকে করে দেশের অন্যান্য জেলায় পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে।
আগে এই বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ ট্রাক পাথর সারাদেশে পাঠানো হতো। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ থেকে ৬ ট্রাকে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে হাজার হাজার পরিবহন ও পাথর শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। এতে বড় অংকের রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে সরকার।
সরেজমিনে দেখা যায়, জ্বালানি সংকটের কারণে অধিকাংশ পাথর ট্রাকে লোড করার অপেক্ষায় পড়ে আছে। অলস অবস্থায় পড়ে আছে পাথর ভাঙার মেশিন। ট্রাক টার্মিনালে খালি ট্রাকের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ট্রাক ও ডাম্প ট্রাক নিয়মিত চলাচল করতে না পারায় পাথর কেনাবেচা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তেলের অভাবে ট্রাকগুলো সময়মতো গন্তব্যে ছেড়ে যেতে পারছে না।
এই খাতের সাথে যুক্ত শ্রমিকরা বর্তমানে চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ডিপোগুলো থেকে প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পেট্রোল পাম্পগুলো থেকে চাহিদার তুলনায় সামান্য পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে। খুচরা বাজারেও জ্বালানি মিলছে না। ফলে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় তেল না পাওয়ায় পাথর পরিবহন করা যাচ্ছে না।
ট্রাক মালিকরা জানান, চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় তারা ট্রাকে পাথর বোঝাই করতে পারছেন না। অনেক ট্রাক এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে খালি অবস্থায় বসে আছে। রবিউল ইসলাম নামে একজন ট্রাকচালক জানান, তেল সংকটের কারণে তার ট্রিপের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে সপ্তাহে ১০টি ট্রিপ দিলেও এখন ৫টি ট্রিপও দিতে পারছেন না। এতে তার আয় কমে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন।
ট্রাক মালিক আরিফ হোসেন গত ১০ বছর ধরে এই বন্দরে ব্যবসা করছেন। তিনি জানান, আগে তার কোনো গাড়ি বসে থাকতো না। কিন্তু এখন তেলের দেখা পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে এক-একটি ট্রাক তিন দিনেও কোনো ট্রিপ দিতে পারছে না।
স্থলবন্দরের কমিশন এজেন্ট জহুরুল ইসলাম জানান, আগে তিনি প্রতিদিন গড়ে ১৫ ট্রাক মাল দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাতেন। বর্তমানে তেলের অভাবে তিনি দিনে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ ট্রাক মাল পাঠাতে পারছেন। তিনি দাবি করেন, দেশে পাথরের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও কেবল তেলের অভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
মেসার্স রুমানা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম জানান, তার পাথরের ডিপো থেকে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০টি ট্রাকে পাথর লোড হতো। জ্বালানি সংকটের কারণে এখন দিনে বড়জোর ১০ থেকে ১২টি ট্রাক লোড হচ্ছে। ব্যবসায় চরম মন্দা চলায় ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
সোনাহাট স্থলবন্দর সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আকমল হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকটে চাহিদা অনুযায়ী ট্রাক না আসায় পাথর কেনাবেচা কমেছে। ব্যবসায়ীদের ডিপোতে পাথরের স্তূপ জমে আছে।
তিনি ভূরুঙ্গামারীর একমাত্র তেলের পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
উপজেলার একমাত্র ফিলিং স্টেশন মেসার্স সাহা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার বিষ্ণুপদ বিশ্বাস জানান, জ্বালানি পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তাদের পাম্প চাহিদার তুলনায় মাত্র তিনভাগের একভাগ তেল পাচ্ছে। সরকারি ট্যাগ অফিসার ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ঘোষণা দিয়ে তারা সব ধরনের জ্বালানি বিক্রি করছেন।
কুড়িগ্রাম জেলা ফুয়েল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জামান আহমেদ জানান, জ্বালানির সরবরাহ আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও তা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে জেলা পর্যায়ের ফিলিং স্টেশনগুলোতে বর্তমানে ডিজেলের বড় কোনো সংকট নেই। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি সঠিক বোঝা যাচ্ছে না, আবহাওয়া ভালো হলে আসল অবস্থা বোঝা যাবে।
সোনাহাট স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক মো. আমিনুল হক জানান, স্থলবন্দরে এলসি আগের মতোই সচল আছে। প্রতিদিন প্রায় শতাধিক ট্রাক ভারত থেকে বন্দরে প্রবেশ করছে। স্থানীয়ভাবে বেচাকেনা কিছুটা কমলেও সরকারের রাজস্ব আয়ে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।


