অভিশপ্ত রানা প্লাজা: জীবন্ত লাশ হয়ে বিচারের প্রতীক্ষা  

অভিশপ্ত রানা প্লাজা: জীবন্ত লাশ হয়ে বিচারের প্রতীক্ষা   
Advertisement
Advertisement

তার কোমর ও পিঠের হাড় ভেঙে গেছে। এখন আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, হাঁটতেও খুব কষ্ট হয়। পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবন বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন নীলুফা ইয়াসমিন। কিন্তু ১৩ বছর আগে রানা প্লাজা ধসের সেই ভয়াবহ দিনে তার জীবনের সব গতি থমকে যায়।

নীলুফা জানান, দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকায় তিনি এখন আর ভালো কোনো চাকরি পান না। বর্তমানে একটি বাড়িতে রান্নার কাজ করে কোনোমতে দিন পার করছেন তিনি। প্রতি বছর এপ্রিল মাস এলে, বিশেষ করে ২৪ তারিখে নীলুফার মনের ক্ষত ও শরীরের ব্যথা আরও বেড়ে যায়।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ধসে পড়েছিল সাভারে রানা প্লাজা ভবন। ওই ভবনের বেশ কয়েকটি তলায় থাকা হাজার হাজার পোশাক শ্রমিকের মধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। নীলুফার মতো অসংখ্য শ্রমিক সেদিনের ঘটনায় পঙ্গু হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।

দুর্ঘটনার সময় নীলুফার বয়স ছিল ৩০ বছর। মেরুদণ্ড ও পিঠে মারাত্মক চোট পাওয়ায় ৪৩ বছর বয়সে এসে এখন তার শারীরিক যন্ত্রণা আরও অসহ্য হয়ে উঠেছে। অসুস্থতার কারণে তার স্বামীও তাকে ছেড়ে চলে গেছেন।

টাইমস অব বাংলাদেশ-এর কাছে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে নীলুফা বলেন, তিনি আজ পর্যন্ত কোনো বিচার বা পর্যাপ্ত সাহায্য পাননি। চিকিৎসার পেছনেই তার জীবনের সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কেউ তার কোনো খোঁজও নেয় না।

রানা প্লাজা ধসে বেঁচে যাওয়া আরেকজন ভুক্তভোগী জেসমিন আক্তার। ওই দুর্ঘটনায় তার মাথায় রক্ত জমাট বেঁধে যায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ডান পা ভেঙে যায়। এছাড়া তার বাঁ পাশের ফুসফুসটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্ঘটনার চার মাস পরেই জেসমিনকে ছেড়ে চলে যান তার স্বামী। সেই দুঃসময়েই তিনি এক সন্তানের জন্ম দেন, যার বর্তমান বয়স ১২ বছর। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার কোনো ব্যবস্থা করতে পারছেন না।

জেসমিন আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, তার এখন আর কাজ করার কোনো শক্তি নেই। তিনি শয্যাশায়ী, নিজেকে একটি জীবন্ত লাশ হিসেবে মনে করেন। বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি এখন মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে দিন পার করছেন।

আরও পড়ুন

কবে শেষ হবে বিচার?

ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় সব মিলিয়ে এক হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই  ঘটনায় পুলিশ একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ দিয়েছিল।

আদালতের সেই নির্দেশনার পর ২৬ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আটকে আছে। এর পাশাপাশি ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে করা আরেকটি মামলাও ঝুলে আছে। সেই মামলায় এখনো একজন সাক্ষীও আদালতে জবানবন্দি দেননি। রাষ্ট্রপক্ষও জানে না কবে নাগাদ এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হবে।

ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ফয়সাল মাহমুদ জানান, হত্যা মামলায় মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তারা আশা করছেন, এ বছরের শেষ নাগাদ বিচার শেষ হবে এবং রায় ঘোষণা করা সম্ভব হবে।

এদিকে ভবন মালিক সোহেল রানার আইনজীবী মাসুদ খান খোকন বলেন, সাক্ষ্য গ্রহণ যেন শেষই হচ্ছে না। তার মক্কেল ১৩ বছর ধরে কারাগারে আছেন। যদি সোহেল রানা নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে তার জীবনের এই ১৩টি বছর কে ফিরিয়ে দেবে সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বর্তমানে ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হত্যা মামলার শুনানি চলছে। পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ এপ্রিল। অন্যদিকে ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চলছে, যার পরবর্তী তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর।

সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর ইশতিয়াক হোসেন জিপু টাইমসকে জানান, সাক্ষীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য পরোয়ানা জারি করা হলেও তাদের আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না। এটি বিচার বিলম্বিত হওয়ার একটি বড় কারণ।

২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল পুলিশ ভবন মালিক সোহেল রানা ও আরও ৪১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিল। অভিযুক্তদের মধ্যে ইতিমধ্যে চারজন মারা গেছেন। বাকিদের মধ্যে ২৫ জন জামিনে আছেন এবং ১১ জন পলাতক। বর্তমানে শুধু সোহেল রানাই কারাগারে বন্দি আছেন।

২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই দিনে রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের দায়ে সাভার থানায় আরেকটি মামলা করেন।

২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে ওই মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুস্তাফিজুর রহমানের আদালতে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় বেনাপোল থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। সেই থেকে এখনো তিনি কারাগারেই আছেন। তবে বিচার না পাওয়ায় নীলুফা ও জেসমিনদের মতো শত শত শ্রমিকের হাহাকার এখনো থামেনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad