অতীতে বেসরকারি কোম্পানিকে সম্পৃক্ত করে চালু হওয়া ঢাকা নগর পরিবহন ব্যর্থ হয়। লোকসানের কারণ দেখিয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বাস প্রত্যাহার করে নেয়।
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে ছয়টি রুটে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ভিত্তিক যে বাস সেবা নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে, সেখানে বর্তমানে চলা পুরোনো বাসই যাত্রী পরিবহন করবে।
মিনিবাসে অতিরিক্ত আসন, ভেতরে নোংরা পরিবেশ, স্বস্তিতে দাঁড়ানোর মতো পরিবেশও নেই, এমনকি ছোট দরজার জন্য ওঠানামা করাই কঠিন–এই বাস্তবতার মধ্যে নিত্য দুর্ভোগে থাকা যাত্রীরা একই বাসে নতুন ধরনের সেবার ঘোষণায় কতটা উপকৃত হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) বলছে, বর্তমানে চলাচলকারী বাসের প্রায় ৪০ শতাংশই নতুন ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারে, কারণ সেগুলোর অবস্থা উপযুক্ত নয়।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুরোনো বাস দিয়ে নতুন রুট চালু করার সিদ্ধান্ত মোটেও যুক্তিসংগত নয়। এতে সেবার মান বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।’
সরকারের উদ্দেশ্য সড়কে শৃঙ্খলা আনা। রাজধানীর সড়কে একই পথে একাধিক কোম্পানির বাসের তীব্র প্রতিযোগিতা, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং নির্ধারিত স্টপেজ না মানার চিত্র দীর্ঘদিনের। মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে বাসগুলো যাত্রীর জন্য ডাকাডাকি করে, সড়কে একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দেয়, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি যানজটও বাঁধে।
পরিস্থিতি বদলাতে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতিতে প্রাথমিকভাবে ১ নভেম্বর থেকে ছয়টি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস। এতে বাসগুলোকে যাত্রীর জন্য নিজেদের মধ্যে আর প্রতিযোগিতায় নামতে হবে না। তারা দিনভর যে আয় করবে, সেই আয় সবার মধ্যে সমবণ্টন হবে।
আরও তিনটি সার্কুলার রুট নির্ধারণ করা হয়েছে, যেগুলো চালু হতে আরও দুই মাস সময় লাগবে। এসব রুটে নতুন বাস দিয়ে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর ডিটিসিএর বৈঠকে রাজধানীতে বাস রুট রেশনালাইজেশন বিষয়ক বৈঠকে বাসের রুট, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, বাসের সংখ্যা ও স্টপেজ নিয়ে আলোচনা হয়। তিন দিন পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কার্যালয়ে হয় আরেক বৈঠক।
ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম বলেন, প্রাথমিক হিসাবে বর্তমানে চলাচলকারী বাসের প্রায় ৬০ শতাংশকে সংস্কার করে নতুন ব্যবস্থায় আনা সম্ভব হতে পারে।
তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় কোনো রুটে খারাপ বা অনুপযুক্ত বাস চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
সার্কুলার রুটে নতুন বাস সরকার নয়, মালিকরাই কিনবেন জানিয়ে ধ্রুব বলেন, প্রাথমিকভাবে ২০০ থেকে ২৫০টি বাসের অর্ডার দেওয়া হতে পারে, যদিও সংখ্যাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সার্কুলার রুটে সর্বোচ্চ ২৮ আসনের মিনিবাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সেগুলো অলিগলিতেও সহজে চলাচল করতে পারে।
ঢাকায় ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস নেটওয়ার্ক চালুর উদ্যোগ অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০১৫ সালে এই উদ্যোগ শুরু, ছয় বছর পর কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর রুটে নামে ঢাকা নগর পরিবহন। ২০২২ সালে আরও দুটি রুট চালু করা হয়।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ৪০০টিরও বেশি বিশৃঙ্খল রুটকে ৪২টিতে নামিয়ে আনা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পরিবহন কোম্পানি বিআরটিসির পাশাপাশি ২২টি বেসরকারি সংস্থা মিলিয়ে এই সেবা চালু হয়। তবে লোকসানের কারণ দেখিয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বাস প্রত্যাহার করে নেওয়ায় পরিষেবাটি মুখ থুবড়ে পড়ে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনও মনে করেন, রাষ্ট্র পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না নিলে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল ব্যর্থ হতে বাধ্য।
বেসরকারি কোম্পানিকে সম্পৃক্ত করে ঢাকা নগর পরিবহনের ব্যর্থতার কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বিআরটিসিকে প্রধান অপারেটর হিসেবে গড়ে তুলতে অন্তত দুই হাজার নতুন বাস দিয়ে শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে ডিটিসিএর ব্যবস্থাপক মো. আসলাম উদ্দিনের আশা তারা সফল হবেন। তিনি বলেন, ‘এবার বাস মালিক সমিতি সহযোগিতা করছে।’
কোন রুটে কত বাস
যে ছয়টি রুটে নতুন সেবা চালু হচ্ছে, সেগুলোতে মোট ৮৩৬টি নন-এসি ও ২০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চলবে।
গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত রুটে সবচেয়ে বেশি ২৫৩টি নন এসি বাস চালাবে ভিআইপি পরিবহন।
প্রধান ডিপো হবে শিববাড়ী। পলাশী মোড়-আজিমপুর অংশে রাখা হবে ১০টি বাস। বর্তমানে এ রুটে ভিআইপি ও বিকাশ পরিবহন চলাচল করছে।
মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত রুটে চলবে ১৩৩টি নন-এসি গাড়ি চালাবে ‘চিড়িয়াখানা সিটি বাস’। ডিপো থাকবে চিড়িয়াখানা/দুয়ারীপাড়া ও কেরানীগঞ্জে। বর্তমানে এ রুটে দিশারী, তানজিল ও মেট্রোলিংক পরিবহন চলাচল করছে।
ঘাটারচর থেকে ডেমরা পর্যন্ত রুটে রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ চালাবে ৭০টি বাস চলবে। বাসগুলো ঘাটারচর ও ডেমরা ব্রিজের নিচে রাখা হবে।
ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত রুটে ফোর স্টার বাস লাইন চালাবে ১৫০টি নন-এসি বাস। বর্তমানে এ পথে রজনীগন্ধ্যা, চালক, সময় ও মিডলাইন পরিবহন চলাচল করছে।
ঘাটারচর থেকে তুরাগের ধউর পর্যন্ত পিএনপি সিটি সার্ভিস চালাবে ১৯০টি বাস। পার্কিং হবে ঘাটারচর ও কামারপাড়ায়। বর্তমানে এ রুটে পরীস্থান ও প্রজাপতি পরিবহন চলাচল করছে।
টঙ্গী থেকে এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত ঢাকা কোম্পানি চালাবে ২০টি এসি বাস।
সার্কুলার তিন রুট
যে তিনটি সার্কুলার বাস রুট চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোতে বাস চালাবে ‘ঢাকা চাকা পরিবহন’। প্রতি রুটে বাস থাকবে ২০টি।
একটি রুট হলো ফার্মগেট-থেকে পান্থপথ সিগন্যাল, সেন্ট্রাল রোড, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট ও আজিমপুর হয়ে পলাশী।
আরেকটি রুট মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড-আসাদগেট, ধানমন্ডি-২৭, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, পলাশী, নিউমার্কেট, জিগাতলা ও শংকর হয়ে বাস মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড।
তৃতীয় রুটটি উত্তরার কদম চত্বর থেকে জমজম টাওয়ার, হাউজ বিল্ডিং, সুইচ গেট, কামারপাড়া, খালপাড়, মেট্রোরেল ডিপো, নর্থ স্টেশন ও সেন্ট্রাল স্টেশন হয়ে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি।


