সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের কারাগারে বর্তমানে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেশটির সরকারের কাছে রায়ের অনুলিপি চেয়ে বাংলাদেশ চিঠি দিয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই দুই বাংলাদেশির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ শুক্রবার সকালে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন প্রতিমন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের বিভিন্ন কারাগারে বাংলাদেশিসহ অন্য দেশের নাগরিকেরা রয়েছেন। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে এখনো প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দী আছেন।’
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির নাম সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো তালিকায় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সৌদি সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। রায়ের অনুলিপি পেলে আমরা জানতে পারব, কী ঘটেছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল।’
শামা ওবায়েদ জানান, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ আগে অবগত ছিল না। সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে।
প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইনি কাঠামো ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘অন্য দেশের বিচারব্যবস্থায় বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে। কোনো বাংলাদেশি নাগরিক দণ্ডিত হলে তার সাজা মওকুফ বা ক্ষমার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা করা হয়।’
দুই বাংলাদেশির বন্দী হওয়ার ওই ঘটনা ২০২৩ সালের উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করেছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ছয় মাসে বিষয়টি সম্পর্কে তারা জানতে পেরেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও ভিসা নবায়নের বিষয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো এবং ভিসা নবায়নের বিষয়ে আমাদের মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন কাজ করছে।’
সংঘাতের কারণে অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, তাদের পুনর্বাসন এবং দেশে নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও সরকার দেখছে, যাতে কেউ বিপদে না পড়েন।’
হুথি হামলায় নিহত শাহেদ আহম্মেদের পরিবারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান দেওয়ার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া অনুদান পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। পরিবারের অন্য প্রয়োজনগুলোও সরকার দেখবে।
বিদেশে বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা দেওয়া এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশন কাজ করছে বলে জানান শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, এ ধরনের সমস্যা সমাধানে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও আইনি বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয় কাজ করে।
বিদেশে বাংলাদেশিদের সহায়তার উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় ২০০ জনের বেশি বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাদের মুক্ত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় কাজ করেছে।
বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের সহায়তায় বিভিন্ন মিশনে শ্রমকল্যাণ উইং রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো বাংলাদেশি মিশন থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে সরাসরি তার সঙ্গে বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। মিশনের কোনো গাফিলতি থাকলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, বর্তমানে বিএমইটি কার্ড নিয়ে বিদেশে যাওয়া কর্মীরা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা পান। প্রবাসী কার্ড চালু হলে এর আওতায় প্রবাসীরা আরও কিছু সুবিধা পেতে পারেন। এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দোয়া করব, ভবিষ্যতে এই যুদ্ধ বন্ধ হোক। বাংলাদেশের নাগরিকসহ কোনো দেশের কোনো নাগরিক বা কোনো মানুষ যেন এ ধরনের নৃশংস হামলার শিকার না হন।’


