জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় জোট তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করেছে। সরকারের বিরুদ্ধে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে তারা ধারাবাহিক কর্মসূচি ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে চাপ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
বিরোধী জোট জানিয়েছে, তারা এখন জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মতো জনজীবন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে। অন্যদিকে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে জনসমর্থন তৈরি করা সম্ভব হবে।
ইতোমধ্যেই গণভোটের পর ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের প্রথম ধাপ শেষ করেছে। এখন শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ধাপের কর্মসূচি। এই পর্যায়ে জোটের শরিক দলগুলো সারা দেশে সমাবেশ, মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে।
একই সঙ্গে জনমত গঠনের লক্ষ্যে ঢাকা ও অন্যান্য প্রধান শহরগুলোতে সভা, সেমিনার ও সমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে শুক্রবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে একটি বড় সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বে আয়োজিত এই সমাবেশ থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানানো হবে।
পরদিন শনিবার একই স্থানে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আরও একটি সমাবেশের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে ‘জুলাইয়ের যোদ্ধা’ এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েছে এই জোট। জোটের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পর সংস্কার ইস্যুতে সরকারের অবস্থান পর্যালোচনা করা হবে। এরপর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সরকারকে চাপে ফেলার জন্য আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
বিরোধী নেতারা বলছেন, তাদের লক্ষ্য সরকারকে অস্থিতিশীল করা নয় বরং তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনে বাধ্য করা। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার জুলাই সনদের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের সেই ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করছে। তবে বিরোধী দল তা মেনে নেবে না এবং পর্যায়ক্রমে আরও কর্মসূচি দেওয়া হবে। জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিরোধীরা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকার মগবাজারে ১১ দলীয় লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক শেষে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই সূচি অনুযায়ী ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত সারাদেশে সমাবেশ ও বিক্ষোভ চলবে এবং পরবর্তীতে ঢাকায় বড় ধরনের কর্মসূচি পালিত হবে।
সংসদ ও রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেও কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে বিরোধী জোট। জোটের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে চান। চলমান এই কর্মসূচিগুলো তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
জোটের এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং মিডিয়া উইংয়ের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি বলেন, গণভোটের ফলাফল অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তারা সরকারকে জুলাই চার্টার কার্যকর করতে বাধ্য করবেন।
এদিকে, সংসদের ভেতরে ও বাইরে উত্তাপ বাড়ছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদন ও সংশোধনী নিয়ে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। গত ১০ এপ্রিল শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
সে সময় শফিকুর রহমান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি দল রাজনৈতিক সমঝোতা লঙ্ঘন করায় তারা সংসদ অধিবেশন বর্জন করছেন। এই ওয়াকআউটের পর থেকেই বিরোধী দলগুলো রাজপথের কর্মসূচি তীব্র করেছে।
জোটের বড় শরীক জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যেতে পারে না। জুলাই সনদকে অবহেলা করার সুযোগ নেই, জনগণের রায়কে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে। সংসদ ও রাজপথ-উভয় জায়গাতেই তারা সক্রিয় থাকবেন বলে তিনি জানান।
সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ১২ মার্চ অধিবেশন শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ে অনুমোদিত না হওয়ায় ১৩টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। এ ছাড়া আরও ৭টি অধ্যাদেশ ৪টি বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০টি অধ্যাদেশ এখন অকার্যকর।
বাতিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালীকরণ, পুলিশ কমিশন গঠন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন।
এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গণভোটের বিধান, তথ্য অধিকার আইন সংশোধন, আয়কর ও শুল্ক সংস্কার, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকিং এবং বেসামরিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোও বাতিল বা অকার্যকর হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি অনুমোদিত হয়েছে এবং ২০টি বৈধতা হারিয়েছে।
বিরোধী নেতাদের দাবি, এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার অর্থ সংস্কার থেকে পিছিয়ে আসা এবং স্বৈরাচারী প্রথার দিকে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত। নির্বাচনের আগে বিএনপি এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও এখন সরকার তা থেকে সরে আসছে বলে তারা অভিযোগ করেন। তবে সরকার পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা সংস্কারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


